Archive for July, 2009|Monthly archive page

নিকোলাস কে রে?

প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক নিকোলাস রে-এর ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর।

কিছুদিন আগে উত্তর নিউইয়র্কে রুশ পরিচালক আন্দ্রেই তারকভস্কির ছবিগুলির একটা বেট্রোস্পেকটিভ হচ্ছিল। আমার এক ফিল্ম নির্মাতা বন্ধু আছে, তার সাথে ফিল্ম রুচির বেশ খানিকটা বেমিল থাকা সত্বেও তাকে জানালাম সেটা। কথাটা শুনে তাকে বেশ বিরক্ত মনে হল, তারকভস্কি সহ সোভিয়েত সিনেমার ব্যাপারে তার একগাদা নিন্দাসূচক কথাবার্তা শোনবার পর ছবিগুলি দেখতে আমাকে একাই যেতে হয়েছে। সেই উত্সবটি শেষ হওয়ার পর ভাবছি কিছুদিন বোধহয় শহরের চলচ্চিত্র পরিবেশ একটু ঠাণ্ডা যাবে — এর মধ্যে দক্ষিণ নিউইয়র্কে শুরু হল নিকোলাস রে চলচ্চিত্র উত্সব। আমার বন্ধুকে সেটা জানাতে সে জিজ্ঞেস করল “কে নিকোলাস রে?” তারকভস্কি তার অপছন্দের হতে পারে, কিন্তু রে অজানা।

নিকোলাস রে-কে অনেকেই সম্পূর্ণ বৈশিষ্টহীন পরিচালক মনে করেন, সেটা আগেও দেখেছি। অন্য দিকে, কারো কারো মতে, রে হচ্ছেন হলিউডের একটা বিশেষ সময় ও মেজাজের তুলনাহীন শিল্পী। অতএব, সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখতে গেলাম রে-এর ১৯৫০ সালের ছবি একাকী – আমার দেখা তাঁর প্রথম ছবি। মূল চরিত্রে কাসাব্লাংকা-খ্যাত হামফ্রে বোগার্ট। সিনেমা হল লোকে লোকারণ্য, একদম সামনের দিকের একটা ফাঁকা সীট দেখে বসে পড়েও রক্ষা নেই, সিনেমা শুরু হওয়ার আগে মিনিট দশেক অনবরত ব্যয়ামের ভঙ্গিতে ওঠ-বস করতে লাগলাম — কারণ একদঙ্গল মেয়ে একসাথে বসবার জায়গা না পেয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসেও ঠিক শান্তি পাচ্ছেনা, বারবার সীট পরিবর্তন করছে, আর তাদের ঢোকবার বেরোবার সময় জায়গা দেবার জন্য লাইনশুদ্ধ লোকের সাথে আমাকেও পিটি করে যেতে হচ্ছে। ছবিটা অবশ্য চমত্কার লাগল। প্রথম দিকটা বেশ হাসির — তুলনাহীন ডায়গল — আবার ও সময়কার হলিউড আর বোগার্টের প্রাক্তন-সৈনিক-এখন-চিত্রনাট্যকার চরিত্রের পোড়-খাওয়া, হিংস্রতার ছোঁয়া লাগানো মনের পরিচয়ও দেয়া হয়ে গেল। বোগার্টের অভিনয় অসাধারণ, এই বিশেষ চরিত্রের করবার জন্য ভদ্রলোক দারুণ রকম মানানসই, এমনকি তাঁর দাঁতের ফাঁক পর্যন্ত তার হাসিকে একটা কেঠো, ক্লান্ত কিন্তু আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দিয়েছে। তবে নায়িকার বাজে অভিনয়, এবং ফিল্মের শেষ দিকে কিছু দুর্বল ডায়লগ ও চরিত্র-চিত্রণের কারণে নিকোলাস রে সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এখনও নিয়ে উঠতে পারিনি। দেখা যাক, আগামী দুসপ্তাহে কি হয়!

মেইনে মোচ্ছব ১

টাকা পয়সায় কুলালে মার্কিনীরা দেশের ভেতরে-বাইরে পর্যটনে অত্যন্তই আগ্রহী। এসব ভাবি পর্যটকদের টেনে আনবার জন্য নিউ-ইযর্কের রাস্তা-ঘাটে-বাসে-ট্রেনে অসংখ্য পর্যটন বিজ্ঞাপন — ভারত-ব্রাজিল থেকে শুরু করে ক্যারিবিয়ানের ক্ষুদ্র দ্বীপ — এ সব জায়গাতেই যাওয়াটা যে কি ভীষণ জরুরী, এবং সেখানকার বাসিন্দারা কিভাবে পর্যটক দেখামাত্র তাদেরকে নিজের পরিবারের (ধনাঢ্য) সদস্যের মত আপন করে নেবে — এসব তথ্যই সেখানে মেলে। অন্য দেশ শুধু নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নানান প্রদেশ ও শহরের পর্যটন-বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। এর মধ্যে মেইন নামে আমেরিকার একদম উত্তর-পূব কোনে যে প্রদেশ, তার একটা বিজ্ঞাপন আমার মনে ধরেছিল। দাঁত-ফোকলা কম বয়েসী একটি মেয়ে একটা মাছ ধরা নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে। হাসি মুখে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর দুহাতে ধরে রেখেছে এত বড় একটা লবস্টার — হাত খানেক লম্বা চিংড়ি জাতীয় একটা প্রাণী — যার বিরাট দাঁড়াগুলো প্লাস্টিকের ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা না থাকলে মেয়েটির হাসি বহু আগেই মিলিয়ে যেত। মোক্ষম বিজ্ঞাপন। লবস্টার অতি সুস্বাদু জিনিস, তার উপর বেশ দামী, আর তার উপর সর্বত্র সহজে পাওয়াও যায় না। বিজ্ঞাপনটির সরল বক্তব্য — মেইনে আসুন এবং (সস্তায়?) বড় বড় লবস্টার খান।

চারদিনের ছুটিতে অবশেষে মেইনে যাওয়া হল সপ্তাহ দুয়েক আগে। দক্ষিণ দিক থেকে গাড়িতে করে মেইনের সীমান্ত পার হওয়া মাত্র আমাদের প্রথম কাজ ছিল একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে লবস্টার রোল খাওয়া। চমত্কার লাগল। শক্ত সিয়াবাটা রুটির ওপর হালকা সস দেয়া প্রচুর পরিমাণে ছাড়ানো লবস্টারের মাংস, তাজা। পরের তিন দিনে মেইন হতাশ করেনি — লবস্টার সহ নানান ধরণের সামুদ্রিক মাছ আমাদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হল। সামুদ্রিক খাবার নিউইয়র্ক বা তার আশপাশ পাওয়া যায়না, তা নয়, নিউইয়র্ক নিজেও তো সমুদ্রেরই ধারে। কিন্তু এ খাবার দামী ও কিছুটা দুর্লভ হওয়ায় বেশ আয়োজন করে, খুঁজে বের করে খেতে হয়। মেইনে লবস্টার খাওয়ার জন্য দামী রেস্টুরেন্টে ঢোকার প্রয়োজনই নেই। ঢুকে পড়া যায় রাস্তার ধারের যেকোন “লবস্টার পাউন্ড”-এ — এবড়ো-খেবড়ো কাঠের দালান, ওপরে লবস্টারের বড় একটা লাল ছবি, সামনে কাঠের ঢাকনা দেয়া বড় বড় হাঁড়িতে জল সিদ্ধ হচ্ছে, তার সামনে খদ্দেরদের জন্য কাঠের চেয়ার-বেঞ্চি পাতা, পাশে মাছের জালের মত জাল ঝুলছে। ভেতরে ছড়ানো গামলায় অসংখ্য লবস্টার-কাঁকড়া ধীরে ধীরে নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে অল্প জলে, বললেই এদের একটিকে জালে বেঁধে সিদ্ধ করে এনে সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে, সঙ্গে অান্ুসঙ্গিক বলতে কিছুটা গরম গলানো মাখন ছাড়া তেমন কিছু নয়। আর শক্ত দাঁড়া ভাঙার জন্য একটা জাঁতি । দাঁড়া ভাঙার কষ্টটা যাঁরা করতে চাননা তাদের জন্য আগেই ছাড়ানো তাজা মাংস রুটিতে রোল করে এনে দেয়া হচ্ছে তত্ক্ষণাত্।

ওপরের ছবিটি একটি কাঁকড়ার। লবস্টার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মুখের স্বাদ বদলাবার জন্য মেইন থেকে চলে আসবার দিন রাস্তার ধারের একটি দোকানে এটিকে আমি গলাধকরণ করি, আমার বোন ও ভগ্নিপতিও সাহায্য করেছে অবশ্য। খেতে গিয়ে দেখি এটির স্বাদ লবস্টারের চেয়ে কম নয় মোটেই, আমার বোন দৌড়ে দোকানের ভেতরে গিয়ে আগে যে দুকেজি লবস্টারের মাংস প্যাকেট করতে বলেছিল, তার সাথে এক কেজি কাঁকড়া যোগ করতে বলে দিল। পাতলা ফোমের একটা বালতিতে বরফ ঢেলে তার উপর এসব মাংস রেখে তবে আনতে হয়েছে তাজা রাখবার জন্য, কিন্তু আসবার পর থেকে দিন কয়েক টানা কাঁকড়ার রোল খেয়ে পুরো কষ্টটাই সার্থক মনে হয়েছে।