লোলা মন্তেস
লোলা মন্তেস আমি পরপর তিনবার দেখেছি কিছুদিন আগে। প্রথম বার বিস্ময়বোধের তীব্রতার কারণে মুখে তেমন কোন ভাবের প্রকাশ ছিলনা। দ্বিতীয়বারে বেরিয়ে আসার সময় মুখে যে পায়েস-খাওয়া হাসি ছিল, সেটি দেখে বাইরে লাইনে পরের-শো-ধরবার-জন্যে-দাঁড়ানো একজন বললেন, “বাহ, খুশি খুশি সব দর্শক!”। তৃতীয়বার এব্যাপারটায় সচেতন থাকবার চেষ্টাসত্বেও একটা তদ্গত মুগ্ধতার ছাপ এড়ানো সম্ভব হয়নি। নান্দনিক আনন্দের চুড়ান্ত যাকে বলে!
লোলা মন্তেস ছবিটি পঞ্চাশের দশকে বানিয়েছিলেন ম্যাক্স ওফ্যল্স। আমার কাছে ম্যাক্স ওফ্যল্স আর গিরিশ ঘোষ একই, অর্থাত্ তাঁর নাম কারণে-অকারণে অনেক শুনেছি, কিন্তু তাঁর শিল্পকর্মের সাথে কোন পরিচয় ছিলনা। তাছাড়া, ছবিটি একরকম হারিয়ে গিয়েছিল। লোলা মন্তেস বাজারে মার খাবার পরে প্রযোজকেরা ছবিটি রি-এডিট করেছিলেন ইচ্ছেমত — ছবির মাস্টার কপিও বোধহয় আর সুরক্ষিত ছিলনা। দীর্ঘদিন পরে গতবছর ফ্রান্সের সিনেমা আর্কাইভ ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ছবিটি ওফ্যল্স-এর আদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনর্নিমিত করে। নিউ ইয়র্ক ফিল্ম উত্সব ২০০৮-এ লোলা মন্তেস দেখানো হচ্ছিল, কিন্তু অনেক আগে খোঁজ করেও টিকিট পাইনি। এতদিন অপেক্ষা করে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি সিনেমা হলে এক সপ্তাহের জন্য ছবিটি দেখাচ্ছে জেনে দেখতে যেতেই হল।
দেদার বাজনা ও ঝাড়বাতির দৃশ্যটি একটি সার্কাসের, এটা বোঝা গেল যখন হাতে একটা চাবুক নিয়ে সং-পরিবেষ্টিত সার্কাস-মাস্টার ঘোষণা করতে থাকেন রাতের সেরা আকর্ষণ লোলা মন্তেস-এর আগমনবার্তা। মায়াবিনী, সার্কাসের অন্যান্য পশুর চেয়ে বহুগুণে হিংস্র, এবং ইউরোপ মহাদেশের বহু খ্যাত-অখ্যাত পুরুষের মস্তক চর্বণকারিণী — ইত্যাকার বিশেষণ-বিভূষিতা লোলা মন্তেস একটা খোলা ঘোড়া-টানা-ছ্যাকড়া গাড়ি ধরনের জিনিসে চেপে উপস্থিত হলেন। সার্কাসের শো-টি আর কিছুই নয় — লোলার কেচ্ছা-কেলেংকারীর জীবনের কিছুটা আদিরসাত্মক পুনরাভিনয়। পুরো ছবি জুড়ে এটাই চলল, আর ছবি শেষ হল যখন শেষ হল অভিনয় — কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে একটু অবসন্ন লোলার স্মৃতি-চারণের ফ্ল্যাশব্যাক। প্রথম ফ্ল্যাশব্যাক শুরু হচ্ছে রোমান্টিক পিয়ানো বাজনা দিয়ে, তারপর দেখছি গ্রামের পথ ধরে চলেছে ঘোড়ায় টানা বেশ বড় ধরণের একটি গাড়ি। গাড়িটি থামিয়ে গাড়োয়ান নেমে এসে একটা মাইল পোস্ট দেখছেন, আর এর মধ্যে গাড়ির ভেতর থেকে লম্বা দেহ এবং চুলওয়ালা এক ভদ্রলোক গলা বের করেছেন। তাঁকে গাড়োয়ান চিত্কার করে বললেন, “মিস্টার লিস্ত, আর বেশিদূর নয়”! এই পর্যায়ের আমি হেসে ফেলেছিলাম, কারণ আমার কেন যেন ধারণা হয়েছিল ওফ্যল্স রসিকতা করছেন। কিন্তু তার পরেই দেখি, তা নয়, লম্বাচুলো ভদ্রলোক আসলেই সংগীতকার ফ্রানজ লিস্ত, এবং লোলা মন্তেসের অন্যতম ও তত্কালীন প্রণয়ী (গাড়ির ভেতর লোলা অবস্থান করছিলেন)। এই লিস্ত সিকুয়েন্সটি (অন্য সব সিকুয়েন্সের মতই) অসাধারণ, আমরা দেখলাম ইউরোপ বিজয়ী সংগীতশিল্পীর তীব্র আত্মপ্রত্যয় — বললেনও লিস্ত একপর্যায়ে “প্রিয়তমা, আমি ফ্রানজ লিস্ত!” — কিন্তু লোলার প্রায় জান্তব কনফিডেন্সের তুলনায় তা কিছুই নয়। ওফ্যল্স তার কাহিনীটি বলে ফেলছেন প্রথমেই — গর্বিত লোলার পতন কাহিনীই ছবির কাহিনী। এই ঝুঁকি বিরাট ঝুঁকি, গল্প বলার কায়দাটি খুব খাশা না হলে দর্শক অচিরেই আগ্রহ হারাতে বাধ্য।
ওফ্যল্স এর টেকনিক অত্যন্ত সাংগীতিক, এত বেশি যে ছবিটির মধ্যে একটা মিউজিক ভিডিও মিউজিক ভিডিও ভাব পর্যন্ত চলে এসেছে। ক্যামেরার নড়াচড়াকে ওফ্যল্স তবলার সংগতের মত ব্যবহার করেছেন মানবদেহের গড়ন-বলন-চলনের সেতার বাদনের সাথে। আমার সন্দেহ, কাউকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখলেই ওফ্যল্স-এর ভাব-সমাধি হত — একটি ফ্ল্যাশব্যাকে সার্কাস মাস্টারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামার দৃশ্যটি যে সুস্পষ্ট আনন্দের সাথে তুলেছেন পরিচালক, তার পরে আর এ ব্যাপারে সন্দেহ করা চলেনা। অনেক অসাধারণ ছবির দৃশ্য ফটোগ্রাফের মত মনে ছাপ কেটে যায় — কিন্তু লোলা মন্তেসের একটি স্থির ইমেজও আমার মনে পড়ছেনা, শুধু মনে পড়ছে অনেক শটের অপ্রত্যাশিত গতিময়তা — সেই সিঁড়ি বাওয়ার শট, একই সিকুয়েন্সে একটি চুম্বন-দৃশ্য, লোলার হঠাত্ দৌড়ানো, হঠাত্ ঘোড়া ছোটানো, হঠাত্ থেমে যাওয়ার অসংখ্য শট।
ওফ্যল্স-এর সিনেমা শুধু গতিময়তার উপর অবশ্য নির্ভরশীল নয়, কিন্তু তাঁর রসবোধ এবং কিছুটি শীতল মানবতাবোধ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ হতে বাধ্য, এবং দীর্ঘ আলোচনা বিদ্বান দুর্জনের মতই পরিত্যাজ্য। এটুকু বলা যাক যে ছবির শেষ শটে তাঁর সব প্রবণতাকে সংহিত করেছেন ম্যাক্স ওফ্যল্স, এবং সেই শটটিই শ্রেষ্ঠতম।
No comments yet
Leave a reply