বাংলাদেশে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্থ – এক

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুসংখ্যক সেনাকর্মকর্তার সাথে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এই বৈঠকে উপস্থিত কে বা কাহারা গোপনে সেখানকার কথোপকথন রেকর্ড করে সেই রেকর্ডিং অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়। এর পরপরই বিভিন্ন ফাইল শেয়ারিং ওয়েবাঙ্গন এবং ইমেইল অ্যাটাচমেন্ট মারফত এই ফাইল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ সংক্রান্ত ইমেইল বা ব্লগ গ্রুপগুলির সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক রয়েছে, এমন প্রায় যে কেউই এই রেকর্ডিং-এর কথা এতদিনে জেনে গেছেন।
রেকর্ডিং-টিতে সেনাকর্মকর্তাদের অনেকেই পিলখানা হত্যাকাণ্ডে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষোভের প্রকাশ বেশ উত্তপ্ত। বিবিসির এই সংবাদ-নিবন্ধটিতে এই রেকর্ডিং থেকে অল্প কিছু বাক্য তুলে দেয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষিতে গত রোববার বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বেআক্কেলের মত ইউটিউব, ইস্নিপ্স সহ বেশ কিছু ফাইল শেয়ারিং ওয়েবাঙ্গনের সাথে বাংলাদেশ থেকে যোগাযোগ করা রোধ করে দেয়। এসব ওয়েবাঙ্গনের অপরাধ, সেগুলিতে উল্লিখিত রেকর্ডিং-টি কেউ আপলোড করে দিয়েছে। বিটিআরসি-র এই অপকর্মটি দুর্ভাগ্যজনক, এবং হাস্যকর। বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান একে সমর্থন করে বিবিসি-তে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছেন, সেটাও অত্যন্ত নিন্দনীয়।

কিছুদিন আগে সচলায়তন ওয়েবাঙ্গনে যোগাযোগ বন্ধ করার প্রেক্ষিতে একটা ব্লগ লিখেছিলাম। সচলায়তন বিষয়ক ঘটনাটির সাথে এবারকারটির পার্থক্য আছে, সেটা প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার। সচলায়তনের ঘটনাটি ছিল বিশুদ্ধ বাক-স্বাধীনতার ইস্যু। এবারের নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারটি কিছুটা তাই, কিন্তু এখানে একটা প্রাইভেসি ইস্যুও আছে। প্রধানমন্ত্রী, সেনাপতি কি কৃষিজীবি — সব মানুষেরই প্রাইভেসীর অধিকার আছে, বা অন্তত থাকা উচিত (এ বিষয়ে আইন-কানুন কি আছে সেটা অামি পরিষ্কার ভাবে জানিনা)। এটা ঠিকই যে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের গুরুত্বপূরণ পদাধিকারীদের প্রাইভেসী সংগত ভাবেই কিছুটা কম, অনেকটা সময়ই তারা সাংবাদিক বা জনসাধারণের সামনে কাটান, এবং বহু বিষয়ে, ব্যক্তিগত বিষয় সহ, মানুষ তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা আশা করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রাইভেসী বলে তাদের কিছু নেই। নিজের সহকর্মী, সহকারী, সেনা সদস্য বা অন্য যে কারো সাথেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অধিকার শেখ হাসিনার রয়েছে। সত্যি বলতে কি, প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বিশ্রীভাবে যাদের প্রাইভেসী এখানে লংঘিত হয়েছে তাঁরা হলেন অপেক্ষাকৃত নিম্ন পদাধিকারী সেনা কর্মকর্তারা। একটি গোপন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা কি বলেছেন না বলেছেন সেটা এখন প্রকাশ পেয়ে গেল, এবং এ তথ্য পরবর্তীতে তাঁদের পক্ষে-বিপক্ষে কিভাবে ব্যবহৃত হবে তা কেউ বলতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, পরবর্তীতে এধরণের “রুদ্ধদ্বার” কিন্তু সম্ভবত মুক্ত-মোবাইল সভায় কেউ মন খুলে কথা বলবেন কিনা, সেটাও দ্বিধার সম্মুখীন হয়ে পড়ল। এসবই অতি দুঃখজনক, এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ সংগত বইকি।

কিন্তু বিটিআরসি-র অপকর্মটি প্রাইভেসী ধামার নিচে চাপা দেয়ার নয়। প্রথমত, নিজেদের স্বপক্ষে তারা এধরণের কোন যুক্তি খাড়া করেনি। বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান বলেছেন, ইউটিউব ইত্যাদি বন্ধ করা হয়েছে “জাতীয় ঐক্য ও সংহতি”-র স্বার্থে (তাঁর উদ্ভট সাক্ষাত্কার নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব)। দ্বিতীয়ত, এই রেকর্ডিং প্রকাশের ফলে যাঁদের প্রাইভেসি লংঘিত হয়েছে, তাঁরা প্রতিবাদ-মামলা যা করার নিজেরাই করতে পারেন, তার জন্য বিটিআরসি-র আগ বাড়িয়ে দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন পড়েনা। আর পাঁচজনের লোকের ব্যক্তিগত কথোপকথন যদি ইউটিউবে আপলোড হয়ে গিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও বিটিআরসি একই কাজ করবে কি? যদি না করে, তাহলে ব্যক্তিগত প্রাইভেসীর বিষয়টি তাদের পক্ষের যুক্তি হিসেবে অবান্তর। তাঁদের যে যুক্তি, “জাতীয় ঐক্য ও সংহতি” সেটিকেই তাহলে ভালভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

চলবে।

No comments yet

Leave a reply