হাডসনের ধারে বাড়ি ১
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বগ্রহণের অনুষ্ঠানটি জানুয়ারির ২০ তারিখে নিয়ম করে ঘটে থাকে, ফলে এসময়টায় ঐতিহাসিক, বর্তমান ও নিকটবর্তী, সব ধরণের প্রেসিডেন্টদের নিয়েই আগ্রহ বেশ বেড়ে যায়। নানান ধরণের ব্যবসা-বাণিজ্যও তুঙ্গে ওঠে — “প্রেসিডেন্ট ওবামার সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি আঁকা এই চিনেমাটির থালাটি আপনি কিনতে পারেন মাত্র ২০ ডলারে। তবে আগামী ২০ মিনিটের মধ্যে অর্ডার দিলে বিনি পয়সায় আরো পাবেন থালাটি রাখবার একটি স্ট্যান্ড এবং প্রেসিডেন্ট ওবামার সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি আঁকা একটি রুমাল”। প্রেসিডেন্টদের জীবনী প্রকাশ এবং পুনঃপ্রকাশের হিড়িক পড়ে — ওয়াশিংটন, জেফারসন, অ্যাডামস প্রমূখ মহারথীরা তো আছেনই, অপেক্ষাকৃত কম জানারাও একটু বেশি জানা হতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি সম্বলিত কোন কিছু কিনবার ইচ্ছা যদিও স্বপ্নেও পোষণ করিনি, তবুও এই রাষ্ট্রপতিক উত্সবে যোগদান করাটা ঘটেই গেছে, কারণ বেশ অদ্ভুতভাবে গত মাসে শ্রেষ্ঠ দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাড়ি বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে।
উত্তর থেকে বয়ে নিউইয়র্ক শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাডসন এক সুরারোপিত নদ — বসন্তে, গ্রীষ্মে এবং গ্রীষ্মান্ত হেমন্তে তার সৌন্দর্য অনন্তপ্রসারী। হাডসনের পূবধার দিয়ে একটি ট্রেন চলে, নিউইয়র্ক শহর থেকে উত্তরে যাওয়ার সময় যখন ট্রেনটি হাডসন ডানে রেখে চলে, তখন মানুষজন ডান দিকের সীটগুলিতে ঠেসে বসে, তাদের চোখ জানালার দিকে ঘোরানো। নিউইয়র্কে ফেরবার সময় সেই একই ট্রেনের ডানের সীট-জানালা ফাঁকা, একটু দেরি করে বা শেষ দিকের স্টেশনে যারা ওঠে, তারাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বামের সীটের কোনটি বসে পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই, গত দু-এক শতাব্দীতে এতদঞ্চলের যারা বনেদী ধনী, তাদের অনেকেরই এ নদীর ধারে এক খানা ম্যানশন জাতীয় বাড়ি আছে বা ছিল। হাইড পার্ক শহরে এমন একটা বাড়িতে জন্মেছিলেন ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ তম রাষ্ট্রপতি। রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, এই পরিচয়েই সম্ভবত তিনি বিশ্বব্যপী পরিচিত, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মার্কিন রাজনীতিতে তার প্রভাব অন্য যেকোন রাষ্ট্রপতির চেয়েই গভীর। গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সময় ক্ষমতা নিয়েছিলেন, বিখ্যাত একাধিক বক্তৃতায় আশ্বস্ত করেছিলেন জনগণকে, এবং অতি দ্রুতগতিতে এমন অনেক অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাদের সত্যিকারের সারতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনমনে উত্সাহ সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা এবং পরবর্তী মার্কিন অর্থনৈতিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক নেই।
রুজভেল্টের এই বাড়ির চারদিকে ছ’শ একরের ঘাসের মাঠ, পাইনের বাগিচা, জাপানী মেপল আর গোলাপের বাগান, স্বচ্ছ ঝরনা, আর রুজভেল্ট আর তাঁর স্ত্রীর সমাধি। রুজভেল্টের পিতামহের আমল থেকেই পরিবারটি ধনশালী, যদিও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দরিদ্রের বন্ধু জাতীয় একটা খ্যাতিই রয়েছে রুজভেল্টের। বাড়ির পাশেই তাঁর নামাঙ্কিত লাইব্রেরী আর জাদুঘর। সত্যি বলতে কি, জাদুঘরটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ছিল। রুজভেল্টের প্রেসিডেন্সীর প্রথম ১০০ দিনের ওপর বিশেষ একটা প্রদর্শনী চলছিল — দেখলাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তৃতার ভিডিও, তাঁর প্রথম এবং বিখ্যাত রেডিও ভাষণ, সেই ভাষণ শুনে মার্কিন জনগণের লেখা চিঠিপত্র, ও সময়কার সংবাদপত্র, কার্টুন, আরো অনেক কিছু। তুলনায় বাড়িটি বাড়িই মাত্র, ঘর, বিছানা, রান্না ঘর, বসার ঘর। তারপরও কোন ঘরে ইংল্যান্ডের রাণী এসে ছিলেন, কোন বিছানায় ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের জন্ম হয়েছিল সেসব দেখে ভালই লাগল।
চলবে…
No comments yet
Leave a reply