পাথরে খোদাই চিহ্ন ২
ডব্লিউ. ড্যানিয়েল হিলিস-এর লেখা এই বইটির নয় অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম দুটি অধ্যায়কে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তিভূমিটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, অর্থাৎ কম্পিউটারের মূল যে বুল প্রবর্তিত যুক্তিবিদ্যা এবং মহামতি শ্যানন (“মহামতি”-র ব্যবহার, এই এক ক্ষেত্রে, মোটেও ইয়ার্কি নয়)-কৃত সেই যুক্তির প্রাযুক্তিক রূপদানের পদ্ধতি — হিলিস এসব নিজস্ব কায়দায় বর্ণনা করেছেন। তারপরের অধ্যায়টির নাম প্রোগ্রামিং, স্বাভাবিক ভাবেই প্রোগ্রামিং ভাষার একটা সহজ উদাহরণ খাড়া করা হয়েছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ফন নয়মান স্থাপত্য নামে কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত কাঠামোর বর্ণনা সঙ্গত ভাবেই চলে এসেছে, কারণ এই স্থাপত্যের সাথে আধুনিক প্রায় সব প্রোগ্রামিং ভাষারই নাড়ির যোগ। চতুর্থ অধ্যায়টি টুরিং মেশিন বিষয়ক, যেটি কম্পিউটার বিজ্ঞানের সবচেয়ে “দার্শনিক” অংশ। এরপর আলগরিদম তত্বের জন্য একটি অধ্যায়, তথ্য তত্ব এবং ক্রিপটোগ্রাফীর জন্য একটি অধ্যায় এবং সমান্তরাল কম্পিউটিং-এর উপর একটি অধ্যায়। শেষের দিকের দুটি অধ্যায়ের লেখক ফিরে এসেছেন আবার কিছুটা টুরিং-জগতে (বারবার “মহামতি” বলাটা কেমন দেখায়, নইলে টুরিং-এর নামের আগেও এটি জুড়ে দেয়া যেত)। কম্পিউটারের পক্ষে কিছু “শেখা” সম্ভব কিনা, এই প্রশ্নটি এসেছে অষ্টম অধ্যায়ে। শেষ অধ্যায়ের নাম “প্রযুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে”, যেখানে ওই শেখার প্রশ্নটি, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নটি নিয়ে তাঁর নিজস্ব দর্শন ও চিন্তাভাবনা হিলিস লিখেছেন।
এই বইয়ের যে উদ্দেশ্য, সেটি সফল হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে ঠিক মত কিছু বলতে পারার ব্যাপারে দুটি সমস্যা। একটা আমার সমস্যা, দ্বিতীয়টি সমস্যাটা কম্পিউটার বিজ্ঞানেরই। দ্বিতীয় সমস্যাটা আগে। সব বিষয় আসলে সহজ ভাষায় সমান ভাবে প্রকাশ করা সহজ নয়, এবং এর সাথে বিষয়টি গুরুত্ব বা সৌন্দর্যের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। এর উদাহরণ এমন দুটি ধ্রুপদী বিষয় দিয়ে দেয়া যাক, যাদের গুরুত্ব নিয়ে কারো সন্দেহ থাকবার কথা নয় — পদার্থবিদ্যা এবং গণিত। পদার্থবিদ্যা নিয়ে যে ব্রিফ হিস্ট্রি অভ টাইম জাতীয় জনপ্রিয় বই লেখা সম্ভব, তার কারণ পদার্থবিদ্যার সমস্যাগুলিকে প্রায় মানবিক নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব — আপনি যদি প্রায় আলোর গতিতে চলতে থাকেন তাহলে আপনার বয়স বাড়বেই না প্রায়, তবে সাবধান, এই করতে গিয়ে কোন ব্ল্যাক হোলে পড়ে যাবেননা যেন, একবার ঢুকলে আর বেরোনো অসম্ভব! তুলনায়, মাথা খুটলেও অ্যালজেবরার মৌলিক তত্ব, বা ফাংশনাল বিশ্লেষণের স্পেকট্রাল তত্ব, বা গালোয়া তত্বের এধরণের বর্ণনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় — বা হয়ত পদার্থবিদ্যা মারফত কিছুটা সম্ভব, তবে সেটা আসল জিনিস হলনা মোটেই। কম্পিউটার বিজ্ঞানের অপ্রাযুক্তিক অংশের, এমনকি প্রাযুক্তিক অংশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
প্রথম সমস্যাটি হল, এই বইটি কম্পিউটার-বিষয়ে-তেমন-জানেন-না, এমন আরো কাছে কতটা আকর্ষণীয় হবে, সেটা আমার পক্ষে বলতে যাওয়াটাই অনধিকার-চর্চা। এটা আগে বুঝতে পারলে কি করতাম বলা কঠিন, কিন্তু এতদূর এসে একটু চেষ্টা করতেই হয়। বইটিতে বেশ কিছু ছবি আছে, কিন্তু আরো থাকলে ভাল হত। অনেক অংশ মনে হয়েছে অতিরিক্ত গদ্যময়, বিশেষত কম্পিউটার স্থাপত্যের অংশগুলি ছবি দিয়ে আরো সহজে ব্যাখ্যা করা যেত। আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশ জটিল কিছু প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যেসব প্রশ্ন এ বইয়ের সাধারণ পাঠকের মনে উদয় হবে কিনা সন্দেহ। যেমন, টুরিং মেশিন-এর উপর অধ্যায়টির প্রথম দিকটা। হিলিস টুরিং-এর বিস্ময়কর ঘোষণার বর্ণনার দিয়েছেন মাত্র, এবং এও লিখেছেন যে ইচ্ছে করলে টুরিং প্রতিজ্ঞার এমন অর্থ করা যায় যে মানব-মনও একটা টুরিং মেশিন বা কম্পিউটার। ভাল কথা। কিন্তু এত বড় বোমাবাজির পর কিভাবে যেন হিলিস অনিশ্চিত সংখ্যা বিষয়ক বেশ টেকনিক্যাল আলোচনায় জড়িয়ে পড়লেন, যেন এই মুহূর্তে পাঠকের মাথায় অনিশ্চিত সংখ্যার সাথে টুরিং প্রতিজ্ঞার সম্পর্কের প্রশ্নটিই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে সেই সব বাক্যগুলিকে, যেখানে হিলিস প্রমান রেখেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানীর বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক-নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির। এর কিছু নিচে তুলে দিলাম, জানিনা কারও ভাল লাগবে কিনা, তবে লাগলে বইটিও হয়ত লাগবে:
- কম্পিউটারের যেসব তাত্বিক সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলি মানুষ এবং কম্পিউটারের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নির্দেশ করেনা।
- এই অ্যালগরিদম, যার নাম মার্জ সর্ট, এতই সুন্দর যে সেটির বর্ণনা না দিয়ে পারছিনা . . .
- “কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা” বিষয়ে দার্শনিকরা প্রচুর আবর্জনা লিখে রেখেছেন।
- তথ্যা আদান-প্রদান এবং তথ্য সংরক্ষণ একই জিনিস, আদান-প্রদান তথ্য হল তথ্য একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো, আর সংরক্ষণ হচ্ছে তথ্য এক সময় থেকে আরেক সময়ে পাঠানো।
- টুরিং-এর মেশিনের সাথে আত্মীয়তায় আমার কোন লজ্জা নেই।
শেষ।
No comments yet
Leave a reply