পাথরে খোদাই চিহ্ন

লোকে যে একটা বিশেষ বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করে থাকে, তা অনেক সময়ই ভবিষ্যতে ভাল চাকরির আশায়। এতে দোষাবহ তো কিছু নেই-ই, এমনকি অনেক অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্বিক এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই শ্রেষ্ঠ মনে করবেন বলে ধারণা করি, এবং আমি দ্বিমতও পোষণ করব না। তারপরও জ্ঞানের সব শাখায়ই থাকে কিছু নিরূপায় রোমান্টিক, প্রিয় বিষয়ের ব্যাপারে যাদের মনোভাব মূলত নান্দনিক। নিজের বিষয়টি দিয়েই উদাহরণ দিই। বেশ কয়েক দশক ধরে কম্পিউটার বিজ্ঞানের দুর্লভ-ভাগ্যের কাল গেছে: ভবিষ্যত-পরিকল্পক, রোমান্টিক, এবং দু-মনোভঙ্গিরই অধিকারী — এই সবরকমেরই চমত্কার সব ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকের উপস্থিতি আশীর্বাদের মত ন্যস্ত হয়েছে এই বিষয়টির মাথায়। বুয়েটে আমাদের প্রথম ক্লাসের দিন প্রকৌশলের অন্য একটি শাখার এক অধ্যাপক পড়াতে এসে প্রথমেই আমাদের করুণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁর বিষয়টি না পড়ে আমাদের কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়বার কারণ কি। সে কথার কি জবাব দিয়েছিলাম আমরা সেটি মনে নেই, তবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের মেধাসত্ব বিশ্বজুড়েই অতুলনীয় ছিল, তার বহু উদাহরণ খাড়া করা খুব কঠিন নয়।

এই শতাব্দীর প্রথম দিকের বাবল-বিস্ফোরণের ফলে এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। প্রচুর আইটি চাকরির হঠাৎ চলে যাওয়ার শংকাজনক দৃশ্যটি দেখবার পর কম্পিউটার বিজ্ঞানের উপর থেকে বহু ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের মা-বাবার মন উঠে গেছে। এ অবস্থায় কি করা যায়, কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংগতভাবেই এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটি আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। আলোচনার দুটি মূল ধারা। একটা সুচিন্তিত এবং স্থিতধী, আরেকটি, স্রেফ রোমান্টিক। প্রথম ধারার প্রবক্তারা নানান ধরণের আইডিয়া দিচ্ছেন:

  • চাকরি-বাকরির এখনকার অবস্থা আর সেই বাবল-বিস্ফোরণের যুগের মত নেই এটা প্রচার করা দরকার।
  • বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অন্য শাখার বিজ্ঞানীরা নেচার, সায়েন্স এসব পত্রিকায় একটু-কম-গভীর ধরণের লেখা লিখে তাঁদের প্রচারণা করে থাকেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা এটা একদম করেননা, এটার পরিবর্তন প্রয়োজন।
  • মেয়েরা কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে চায়না, এমনকি গণিতের চেয়েও কম্পিউটার বিজ্ঞানে মেয়ে কম, এটির পরিবর্তন জরুরী। ইত্যাদি।

তুলনায়, রোমান্টিকদের মূল অনুভূতিটি প্রায় যুক্তিবহির্ভূত বিস্ময়ের। উদাহরণস্বরূপ, আমার চেনা সেরা কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের একজন ই-মেইল লিখে প্রকাশ্যে জানালেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানের সৌন্দর্য্য যে কারো কাছে স্বতঃপ্রতীয়মান না হতে পারে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, এবং এরকম যদি কেউ থেকেও থাকে তাকে কেন আমরা দলে টানতে চাইব সেটা তাঁর বোধবুদ্ধির বাইরে। আমি নিজে, যদি এখনও স্পষ্ট না হয়ে থাকে, চোরা-রোমান্টিক। নিজের রোমান্টিক মনোভাবকে যখন মনোবিকার মনে হয় মাঝে মাঝে, তখন উল্টো কিছু কাজ করে থাকি। নেচারে কোন লেখা পাঠাবার দুশ্চেষ্টা যদিও এখনও করিনি, পড়ে দেখেছি এরকম দু-একটি নিবন্ধ। “সাধারণ জনগণ”-এর মধ্যে কম্পিউটার বিজ্ঞান-চেতনা কিভাবে বাড়ানো সম্ভব এ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে ভাবলাম, “এ ব্রিফ হিস্ট্রি অভ টাইম” জাতীয় সহজপাঠ্য বই কি এ বিষয়ে আদৌ আছে? সেই খোঁজ করতে গিয়ে পেলাম একটি বইয়ের। বইটির নাম — পাথরে খোদাই চিহ্ন: যেসব সহজ আইডিয়া নিয়ে কম্পিউটার। পরের পর্ব এই বই নিয়ে।

চলবে …


No comments yet

Leave a reply