ফিল্ম উৎসব ১ঃ বিড়াল অন্তর্ধান

কিছুদিন আগে শেষ হওয়া রেইকয়াভিক ফিল্ম উৎসবে দেখা ছবিগুলির উপর যেসব নোট নিয়েছি সেগুলি ঝেড়ে মুছে প্রকাশ করা হবে। আজকের ছবি, দ্য ক্যাট ভ্যানিশেস

বিশ্রী রকমের বাজে ছবি দিয়ে রেইকয়াভিক ফিল্ম উৎসবের অভিজ্ঞতা শুরু হল। গত বছর অলসতা ও ব্যস্ততা মিলিয়ে কোন ছবিই দেখে উঠতে পারিনি, তাই এবার অনেক ছবি দেখার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিল। একটা পাস কিনে নিয়েছিলাম, কাজেই সব টিকেট ফ্রি। প্রথম দিন দেখতে গেলাম ইসরায়েরী ছবি রেস্টোরেশন, কিন্তু হলে গিয়ে দেখি ওই ছবি বাতিল, উৎসবে আদৌ দেখানো হবে না। ঢুকে পড়লাম বিড়াল অন্তর্ধান দেখতে।

মনস্তাত্বিক থ্রিলার এমন একটা জানরা, যেখানে সম্ভাব্য জনপ্রিয়তার সাথে আর্ট-হতে-হলে-চাই জটিলতার সমন্বয় সম্ভব। সম্ভব মানেই সবাই পারবে তা নয়, পরিচালক কার্লোস সোরিনও পারলেন না আরকি।

ছবির গল্পের শুরুটা মন্দ নয় — সহকর্মীকে বেধড়ক পিটিয়ে হেমায়েতপুরে এক প্রফেসর (নাম লুই)। লুই অমূলক(?) সন্দেহ করছিলেন যে ওই সহকর্মী তাঁর গবেষণার নোটপত্র চুরি করছে। ঘটনার সময় নিজের স্ত্রী বিয়েট্রিজকেও লুই আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিলেন (এসব ঘটেছে লুই-বিয়েট্রিজের বাড়িতে)। ছবি শুরু হচ্ছে লুই যেদিন মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন সেদিন। এখন, কার্লোস সোরিন এই পুরো ব্যাপারটা দেখাতে চান না, তাই ছবি শুরু করছেন মানসিক ডাক্তারদের একটি মিটিং দিয়ে। এই মিটিং-এ ৪জন ডাক্তার লুই-এর কেসটা পর্যালোচনা করছেন তাঁকে ছেড়ে দেবার আগ দিয়ে। এই দৃশ্য থেকেই ব্যাকস্টোরিটা আমরা জানছি। দুর্ভাগ্যক্রমে, এই সাধারণ দৃশ্যটিতেই এমন কিছু সমস্যা আছে, যা পুরো ছবিটা সম্বন্ধেই প্রযোজ্য।

প্রথমত, ক্লোজ আপের অবিরাম ও অসহ্য ব্যবহার। টাকা বাঁচানোর জন্য কিনা জানিনা, অধিকাংশ শটই ক্লোজ আপ। এর ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে — সাসপেন্স তৈরি হওয়ার বদলে কাহিনীতে যা কিছু সাসপেন্স ছিল, তাও কেঁচে গেছে। দ্বিতীয়ত, প্বার্শ চরিত্রগুলির ব্যাপারে একটা কি-করি-কোথায়-রাখি অবস্থা। ব্যাপারটা এরকম। কাহিনীগত প্রয়োজনে কিছু প্বার্শচরিত্র দরকার পরিচালকের (যেমন ডাক্তারের দল)। কিন্তু তাদের স্রেফ সহজ ন্যারেশনের জন্য ব্যবহার করে ছেড়ে দেবেন, এটা আবার তাঁর প্রাণে সইছে না। কাজেই ডাক্তারি সীনে চরিত্রচিত্রণের চেষ্টা, হাস্যরস তৈরির চেষ্টা সবই করে গেছেন সোরিন। কিন্তু এই চরিত্রগুলির পরে আর কোন ব্যবহার নেই, কাজেই সকলি গরল ভেল। লুই-বিয়েট্রজের মেয়ে ও তার আদিবাসী বয়ফ্রেন্ড এজাতীয় চরিত্রের আরেক উদাহরণ।

ছাড়া পাওয়া লুই কে নিয়ে বাড়িতে আসার পর বিয়েট্রিজের ভয় ও অস্বস্তিই ছবির মূল অংশ, কিন্তু এখানেও ছবিটির কোন উন্নতি ঘটতে দেখলাম না। বিড়াল মোটিফটা ঠিক আছে, কিন্তু শুধু ও দিয়ে ছবি হয় না।

দুটি ভাল সীন ছিল। একটি হল এক রাতে বিয়েট্রিজের ভয় পেয়ে ঘুম থেকে ওঠার দৃশ্যটি। আরেকটা দৃশ্য আছে ছবির প্রথম দিকে, যেখানে বিয়েট্রিজ লুইকে জিজ্ঞেস করছেন “তোমার চোখে কি জল?”। এই তো।

হারাকিরি

উল্লেখ‍্যঃ রুপালী কিবোর্ডে লিখছি। ইউডিটে অভ‍্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু অামার ম্যাকে কিছুতেই জিনিসটাকে কাজ করাতে পারলাম না। অতএব। লেখার গতি খুবই কম।

মাসাকি কোবায়াশি-র হারাকিরি ছবিটি অনেকদিন যাবতই দেখব-দেখব করছি, দেখা হচ্ছিল না। কয়েকদিন অাগে সময় বের করে দেখেই ফেললা‍্ম।এই ছবিটির একটি স্পষ্ট বক্তব্য অাছে — ছবির শুরুতেই তা স্পষ্ট এবং পরের দুঘণ্টা দশ মিনিটে কখনই গোপন নয়। সমাজ, সংস্কার বা গুরুত্বপূর্র্ণ ব্যক্তির ‘ভাবমূর্তি‘ রক্ষা করার প্রচেষ্টা অমানবিকতার জন্ম দিতে পারে, এটাই একটানা, ধীর, ক্ষমাহীন ভঙ্গীতে বলে গেছেন কোবায়াশি।

এ ধরণের ছবি ‘মুই কি হনুরে‘ ভাবের কারণে বিরক্তি উৎপাদন করতে পারে। হারাকিরি অবশ্য অসাধারণ। এর কারণঃ এক, কোবায়াশির চিত্রকল্পের সামুরাই-সুক্ষ্মতা। দুই, এই থীমের জন্য হারাকিরি কণ্টকিত মধ্যযুগীয় জাপানের চেয়ে ভাল পটভূমিকা হতেই পারেনা, সামুরাই হারাকিরি করতেন সাধারণত সম্মান রক্ষার জন্যই।

চিন্তাবাষ্প

মেরিল লিঞ্চের সাথে আমাদের ফুটবল খেলা ছিল। বিস্ময়বিহ্বল চিত্তে খেলতে গেলাম, কারণ আমার ধারণা ছিল কোম্পানীটি কিছুদিন আগে লোপ পেয়েছে। ঠিক করেছিলেম, এ নিয়ে তাদেরকে একটু স্লেজিং করব, কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর তারা এমন দৌড়াদৌড়ি শুরু করল যে জিভ স্মেজিং এর কাজে ব্যবহার করা যায়নি, বের করে রাখতে হয়েছে। ৭-৫ গোলে হেরে হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এসে একটি টেক্স-মেক্স খাবারের দোকানে ঢুকলাম।

দোকানে প্রচণ্ড গরম, দু-দুটো ফ্যান ঘুরেও কিছুতে কায়দা করতে পারছেনা। দোকানে কোন খদ্দের নেই, আর দোকান চালাচ্ছে যারা তারা সবাই চীনে। টেক্স-মেক্স খাবার যেহেতু মেক্সিকো এবং তার লাগোয়া টেক্সাসের খাবারের সমন্বয়, কাজেই এই চীনেদের দেখে কিছুটা অবাক হলাম, ক্লান্ত এবং আক্ষরিক অর্থেই উত্তপ্ত মস্তিষ্কে নিম্নলিখিত চিন্তাগুলি ভেসে বেড়াতে লাগল –

১. চীনেরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেক্স-মেক্স এর দোকান এরা চালাচ্ছে কেন?
২. কি খাওয়া যায়?
৩. এদের কি কোন সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রও নেই? একদম সাধারণ একটা টেক্স-মেক্স এর দোকান করে রেখেছে, একটু চীনে ছোঁয়া থাকলেও তো হত!
৪. খাব কি? চীনে চা কি পাওয়া যাবে? মনে হয়না — যা ভেবেছিলাম, ব্যক্তিত্বহীন দোকান। বুরিতো খাই বরং।

জিজ্ঞেস করলাম “সব্জির বুরিতো আছে নাকি?” সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলা আঙুল দিয়ে কাগজে ছাপানো একটা মেনুতে দেখিয়ে দিলেন, সবজি বুরিতো আছে। সেটা অর্ডার দিয়ে সেই “সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র”-এর ব্যাপারটাই আবার ভাবছি দেখি পাশে একটা বড় অ্যাকোরিয়ামে কিছু লাল মাছ ঘোরাফেরা করছে। চীনে রেস্টুরেন্টে প্রায়শই অ্যাকোরিয়ামে থাকে, এবং সম্পর্কটি গভীর বলেই আমার সন্দেহ, কারণ অ্যাকোরিয়ামের সাথে চীনে বাগানের মিলটা চোখে পড়ার মত। এটা চোখে পড়ার পর একটু লজ্জিত হাসি হেসে বাড়িয়ে দেয়া বুরিতো-টি হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসলাম, আমার অবান্তর হাসিতে অবাক হয়ে ভদ্রমহিলা তাকিয়ে রইলেন।

প্রচুর ব্রকলি দেয়া বুরিতোটি চিবাতে চিবাতে একটা “সাউথ ইন্ডিয়ান কোশার” দোকানের নিচ দিয়ে হেঁটে চলে আসলাম। খেতে জঘন্য লাগল।

নিকোলাস কে রে?

প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক নিকোলাস রে-এর ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর।

কিছুদিন আগে উত্তর নিউইয়র্কে রুশ পরিচালক আন্দ্রেই তারকভস্কির ছবিগুলির একটা বেট্রোস্পেকটিভ হচ্ছিল। আমার এক ফিল্ম নির্মাতা বন্ধু আছে, তার সাথে ফিল্ম রুচির বেশ খানিকটা বেমিল থাকা সত্বেও তাকে জানালাম সেটা। কথাটা শুনে তাকে বেশ বিরক্ত মনে হল, তারকভস্কি সহ সোভিয়েত সিনেমার ব্যাপারে তার একগাদা নিন্দাসূচক কথাবার্তা শোনবার পর ছবিগুলি দেখতে আমাকে একাই যেতে হয়েছে। সেই উত্সবটি শেষ হওয়ার পর ভাবছি কিছুদিন বোধহয় শহরের চলচ্চিত্র পরিবেশ একটু ঠাণ্ডা যাবে — এর মধ্যে দক্ষিণ নিউইয়র্কে শুরু হল নিকোলাস রে চলচ্চিত্র উত্সব। আমার বন্ধুকে সেটা জানাতে সে জিজ্ঞেস করল “কে নিকোলাস রে?” তারকভস্কি তার অপছন্দের হতে পারে, কিন্তু রে অজানা।

নিকোলাস রে-কে অনেকেই সম্পূর্ণ বৈশিষ্টহীন পরিচালক মনে করেন, সেটা আগেও দেখেছি। অন্য দিকে, কারো কারো মতে, রে হচ্ছেন হলিউডের একটা বিশেষ সময় ও মেজাজের তুলনাহীন শিল্পী। অতএব, সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখতে গেলাম রে-এর ১৯৫০ সালের ছবি একাকী – আমার দেখা তাঁর প্রথম ছবি। মূল চরিত্রে কাসাব্লাংকা-খ্যাত হামফ্রে বোগার্ট। সিনেমা হল লোকে লোকারণ্য, একদম সামনের দিকের একটা ফাঁকা সীট দেখে বসে পড়েও রক্ষা নেই, সিনেমা শুরু হওয়ার আগে মিনিট দশেক অনবরত ব্যয়ামের ভঙ্গিতে ওঠ-বস করতে লাগলাম — কারণ একদঙ্গল মেয়ে একসাথে বসবার জায়গা না পেয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসেও ঠিক শান্তি পাচ্ছেনা, বারবার সীট পরিবর্তন করছে, আর তাদের ঢোকবার বেরোবার সময় জায়গা দেবার জন্য লাইনশুদ্ধ লোকের সাথে আমাকেও পিটি করে যেতে হচ্ছে। ছবিটা অবশ্য চমত্কার লাগল। প্রথম দিকটা বেশ হাসির — তুলনাহীন ডায়গল — আবার ও সময়কার হলিউড আর বোগার্টের প্রাক্তন-সৈনিক-এখন-চিত্রনাট্যকার চরিত্রের পোড়-খাওয়া, হিংস্রতার ছোঁয়া লাগানো মনের পরিচয়ও দেয়া হয়ে গেল। বোগার্টের অভিনয় অসাধারণ, এই বিশেষ চরিত্রের করবার জন্য ভদ্রলোক দারুণ রকম মানানসই, এমনকি তাঁর দাঁতের ফাঁক পর্যন্ত তার হাসিকে একটা কেঠো, ক্লান্ত কিন্তু আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দিয়েছে। তবে নায়িকার বাজে অভিনয়, এবং ফিল্মের শেষ দিকে কিছু দুর্বল ডায়লগ ও চরিত্র-চিত্রণের কারণে নিকোলাস রে সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এখনও নিয়ে উঠতে পারিনি। দেখা যাক, আগামী দুসপ্তাহে কি হয়!

মেইনে মোচ্ছব ১

টাকা পয়সায় কুলালে মার্কিনীরা দেশের ভেতরে-বাইরে পর্যটনে অত্যন্তই আগ্রহী। এসব ভাবি পর্যটকদের টেনে আনবার জন্য নিউ-ইযর্কের রাস্তা-ঘাটে-বাসে-ট্রেনে অসংখ্য পর্যটন বিজ্ঞাপন — ভারত-ব্রাজিল থেকে শুরু করে ক্যারিবিয়ানের ক্ষুদ্র দ্বীপ — এ সব জায়গাতেই যাওয়াটা যে কি ভীষণ জরুরী, এবং সেখানকার বাসিন্দারা কিভাবে পর্যটক দেখামাত্র তাদেরকে নিজের পরিবারের (ধনাঢ্য) সদস্যের মত আপন করে নেবে — এসব তথ্যই সেখানে মেলে। অন্য দেশ শুধু নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নানান প্রদেশ ও শহরের পর্যটন-বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। এর মধ্যে মেইন নামে আমেরিকার একদম উত্তর-পূব কোনে যে প্রদেশ, তার একটা বিজ্ঞাপন আমার মনে ধরেছিল। দাঁত-ফোকলা কম বয়েসী একটি মেয়ে একটা মাছ ধরা নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে। হাসি মুখে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর দুহাতে ধরে রেখেছে এত বড় একটা লবস্টার — হাত খানেক লম্বা চিংড়ি জাতীয় একটা প্রাণী — যার বিরাট দাঁড়াগুলো প্লাস্টিকের ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা না থাকলে মেয়েটির হাসি বহু আগেই মিলিয়ে যেত। মোক্ষম বিজ্ঞাপন। লবস্টার অতি সুস্বাদু জিনিস, তার উপর বেশ দামী, আর তার উপর সর্বত্র সহজে পাওয়াও যায় না। বিজ্ঞাপনটির সরল বক্তব্য — মেইনে আসুন এবং (সস্তায়?) বড় বড় লবস্টার খান।

চারদিনের ছুটিতে অবশেষে মেইনে যাওয়া হল সপ্তাহ দুয়েক আগে। দক্ষিণ দিক থেকে গাড়িতে করে মেইনের সীমান্ত পার হওয়া মাত্র আমাদের প্রথম কাজ ছিল একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে লবস্টার রোল খাওয়া। চমত্কার লাগল। শক্ত সিয়াবাটা রুটির ওপর হালকা সস দেয়া প্রচুর পরিমাণে ছাড়ানো লবস্টারের মাংস, তাজা। পরের তিন দিনে মেইন হতাশ করেনি — লবস্টার সহ নানান ধরণের সামুদ্রিক মাছ আমাদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হল। সামুদ্রিক খাবার নিউইয়র্ক বা তার আশপাশ পাওয়া যায়না, তা নয়, নিউইয়র্ক নিজেও তো সমুদ্রেরই ধারে। কিন্তু এ খাবার দামী ও কিছুটা দুর্লভ হওয়ায় বেশ আয়োজন করে, খুঁজে বের করে খেতে হয়। মেইনে লবস্টার খাওয়ার জন্য দামী রেস্টুরেন্টে ঢোকার প্রয়োজনই নেই। ঢুকে পড়া যায় রাস্তার ধারের যেকোন “লবস্টার পাউন্ড”-এ — এবড়ো-খেবড়ো কাঠের দালান, ওপরে লবস্টারের বড় একটা লাল ছবি, সামনে কাঠের ঢাকনা দেয়া বড় বড় হাঁড়িতে জল সিদ্ধ হচ্ছে, তার সামনে খদ্দেরদের জন্য কাঠের চেয়ার-বেঞ্চি পাতা, পাশে মাছের জালের মত জাল ঝুলছে। ভেতরে ছড়ানো গামলায় অসংখ্য লবস্টার-কাঁকড়া ধীরে ধীরে নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে অল্প জলে, বললেই এদের একটিকে জালে বেঁধে সিদ্ধ করে এনে সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে, সঙ্গে অান্ুসঙ্গিক বলতে কিছুটা গরম গলানো মাখন ছাড়া তেমন কিছু নয়। আর শক্ত দাঁড়া ভাঙার জন্য একটা জাঁতি । দাঁড়া ভাঙার কষ্টটা যাঁরা করতে চাননা তাদের জন্য আগেই ছাড়ানো তাজা মাংস রুটিতে রোল করে এনে দেয়া হচ্ছে তত্ক্ষণাত্।

ওপরের ছবিটি একটি কাঁকড়ার। লবস্টার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মুখের স্বাদ বদলাবার জন্য মেইন থেকে চলে আসবার দিন রাস্তার ধারের একটি দোকানে এটিকে আমি গলাধকরণ করি, আমার বোন ও ভগ্নিপতিও সাহায্য করেছে অবশ্য। খেতে গিয়ে দেখি এটির স্বাদ লবস্টারের চেয়ে কম নয় মোটেই, আমার বোন দৌড়ে দোকানের ভেতরে গিয়ে আগে যে দুকেজি লবস্টারের মাংস প্যাকেট করতে বলেছিল, তার সাথে এক কেজি কাঁকড়া যোগ করতে বলে দিল। পাতলা ফোমের একটা বালতিতে বরফ ঢেলে তার উপর এসব মাংস রেখে তবে আনতে হয়েছে তাজা রাখবার জন্য, কিন্তু আসবার পর থেকে দিন কয়েক টানা কাঁকড়ার রোল খেয়ে পুরো কষ্টটাই সার্থক মনে হয়েছে।

মোবি ডিক

ঠিক মনে করতে পারছিনা কেন, হঠাত্ ঠিক করলাম হারমান মেলভিলের লেখা পড়তে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম তার প্রধান উপন্যাস দুটি — মোবি ডিক, আর বিলি বাড, নাবিক। ঠিক করলাম প্রথমে বিলি বাড পড়ব। এর একটা কারণ এই যে উপন্যাসটি সংক্ষিপ্ততর, মোবি ডিকের ৫০০ পাতার মেদ হজম করাটি কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। বিলি বাড অনেক ছোট, উপন্যাসিকা বললেই হয়।

এই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে প্রত্যেকদিন বিলি বাড খুলে নিতাম বিছানায় শুয়ে, ঘন্টাখানেকের ধস্তাধস্তিতে তিন চার অনুচ্ছেদ পড়তাম, মাথায় কিছুই প্রবেশ করত না — এবং অতিদীর্ঘ গসাগু কষবার সময় যেভাবে খাতার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দাগ ও সংখ্যা ক্রমশ-হ্রস্ব হতে হতে মিলিয়ে যায়, আমার উত্সাহও একই প্রক্রিয়ায় খাট হতে থাকল। যে সংকলনের অংশ ছিল উপন্যাসটি, অনেক কষ্টে সেখান থেকে একটি ছোট গল্প পড়ে নিজের মেলভিল অাগ্রহের সলিল সমাধি দিলাম।

যেটা করা উচিত ছিল, সেটাই করা শুরু করলাম কিছুদিন আগে। মোবি ডিক পড়া শুরু করলাম। মোবি ডিক মেলভিলের প্রধান উপন্যাস, এবং মার্কিন সাহিত্যের মহত্তম মাস্টারপীস-গুলির মধ্যে গণ্য। অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। তিমি মেরে তার তেল বের করে বিক্রি করাটি কয়েক শত বছর যাবত একটা বিরাট ব্যবসা ছিল। ম্যাসাচুসেটস-এর উপকূল থেকে একটি তিমি ধরা জাহাজ এই একই কারণে রওনা দেয়, কিন্তু রওনা দেয়ার পর জাহাজের নাবিক ও শিকারীরা জানতে পারে যে এই যাত্রার উদ্দেশ্যটি একটু ভিন্ন। মোবি ডিক নামে পরিচিত বিশালায়তন, হিংস্র ও অসাধারণ বুদ্ধিমান একটি বিশেষ তিমিকে মারাটাই এই যাত্রার লক্ষ্য, কারণ জাহাজের ক্যপ্টেন এহ্যাব এর আগের এক যাত্রায় এই তিমির হাতে তার পা, কিছু সহযাত্রী এবং মান-সম্মান খুইয়েছেন। সারা পৃথিবীর মহাসাগরগুলিতে ঘুরে এহ্যাবের জাহাজ খুঁজে বেড়াতে থাকে মোবি ডিককে, আর মাঝে মাঝে তাদের দেখা হয় সেই তিমির হাতে পরাজিত অন্য জাহাজের বিষন্ন নাবিকদের সাথে। ভয়ংকর টেনশন! টেনশন আরো বেশি, কারণ মোবি ডিক সুবিখ্যাত হলেও শিকারীরাও কম নয়, জাহাজের অসাধারণ হারপুন ক্ষেপকদের সাথে মেলভিল আমাদের খুব ভাল ভাবেই পরিচয় করিয়ে দেন।

শেষ সীনে কি হয়, সেটা অবশ্যই এখানে বলছিনা। তবে বইটি আবার পড়বার প্রয়োজন বোধ করছি। আমার বদভ্যাস আছে, গোয়েন্দা কাহিনী বা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী প্রথমবার ঠিক রসিয়ে রসিয়ে পড়তে পারিনা — বাসে করে দীর্ঘ যাত্রার পর অনেকক্ষণ চেপে রাখা যাত্রী যেভাবে হালকা হওয়ার জন্য ছুটতে থাকেন, কাহিনীর শেষ জানবার জন্য কিছুটা সেভাবেই অগ্রপশ্চাত না তাকিয়ে এগোতে থাকি। মোবি ডিক তার অ্যাডভেঞ্চার-আবহ সত্বেও সূক্ষ্ম ব্যাপার, অন্তত আরেকবার না পড়লে চলবে না।

উল্লেখ্য, বিলি বাডের যে সমস্যা, মোবি ডিকেও সেটা রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজী গদ্য কঠিন, এবং অতি দীর্ঘ বাক্যে আকীর্ণ, কিন্তু আমার (অল্প) অভিজ্ঞতায় মেলভিলের মত আর কিছুই নয়। তবে মোবি ডিকের করলা খেয়ে সুবিধে হয়েছে, বিলি বাডের নিম আর ততটা অসহ্য মনে হচ্ছেনা। পরশুদিন থেকে আবার ধরেছি বিলি বাড, পাঁচ পাতা পড়েছি।

স্টাইনবেক সরলতা ২

অভ মাইস এন্ড মেন এর পটভূমিকা ১৯২০ এর ক্যালিফোর্নিয়া। ছবির প্রধান চরিত্র জর্জ এবং লেনি, তারা কৃষি-শ্রমিক, ঘুরে ঘুরে মধ্য ক্যালিফোর্নিয়ার র ্যাঞ্চ-গুলিতে কাজ করে। লেনি পাগল ধরনের, কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী। যেখানেই তারা কাজ করতে যায়, লেনি কিছুদিনের মধ্যে একটা ভয়ংকর ধরণের দুর্ঘটনা ঘটায়, এবং জর্জ ও তাকে পলায়ন কার্য সমাধা করতে হয়। এরকমই একটি জায়গা থেকে পালিয়ে বেশ দূরে নতুন র ্যাঞ্চে কাজ খুঁজে নিতে এসে সালিনাস নদীর তীরে যখন তারা এসে বসেছে, তখন থেকে স্টাইনবেক তাদের সঙ্গ নিয়েছেন। এই ছোট উপন্যাসের নাটকীয় গঠন এই সূচনা-পর্বেই স্পষ্ট, কাহিনীর বিকাশের যাবতীয় উপাদান — লেনির বিপজ্জনক কিন্তু সরল ও অগঠিত মন, তদসত্বেও তার প্রতি জর্জের গভীর স্নেহ, কিছুটা টাকা জমিয়ে নিজেদের কিছু জমি কেনবার তাদের যৌথ স্বপ্ন — এসবই সেই নদীর ধারেই আমরা জানতে পারি। এর পর যেভাবে গল্পটি গড়িয়েছে, তা খুব অপ্রত্যাশিত না হলেও মর্মস্পর্শী।
লেখকের একটি স্টাইল হল — একটা অধ্যায়ের শুরুতে প্রকৃতি বা স্রেফ একটা ঘরের পেন্টার-সুলভ বর্ণনায় কিছুটা সময় নেন, পরিবেশ তৈরি করেন। এই স্টাইলকে সিনেমাসংগতও বলা চলে, চলচ্চিত্রে যেমন একটি নতুন সিকুয়েন্স শুরু হয় বর্ণনাধর্মী মাস্টারশট দিয়ে, অনেকটা সেরকম। তার পরই সাধারণত চরিত্রগুলির মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়, এবং শুরু হয় জন স্টাইনবেকের প্রধান সাধনা — মানুষের আশা-আকাঙ্খা কিভাবে অন্য মানুষের সাথে  তার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তার অনুসন্ধান –
“দেখ, এসব কথা আমি কাউকে আগে বলিনি। বলা উচিতও না হয়ত। আমার স্বামীকে আমার পছন্দ না। সে লোক ভাল নয়।” মেয়েটি গোপন কথাগুলি তাকে বলল, আর বলল বলেই তার আরও কাছে এগিয়ে এল, আর বসল পাশে।

যে মেয়েটির কথা বলা হচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে সে বইয়ের কালো একটি চরিত্রকে এমন কটি কথা বলেছে, সাহিত্যর ইতিহাসে তার মত অমানবিক, হিংস্র কথা বোধহয় খুব কমই আছে — এখন এই এক বাক্যাংশে স্টাইনবেক তার মনুষ্যত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন। সহজ কথা নয়!
বইটা শেষ করার দিন চারেক পরে নিউইয়র্কের একটি রেস্টুরেন্টের পুরনো দু-বন্ধুর সাথে দেখা করলাম। রেস্টুরেন্টে প্রচণ্ড ভিড়, আর বসার জায়গা পাওয়ার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে জিজ্ঞেস করে বারবারই মিছে কথা শুনতে হচ্ছে, তার পরও তীর্থের কাকের মত দাঁড়িয়ে আছি — কারণ দেখতে পাচ্ছি রেস্টুরেন্টের ভেতরে সুন্দরী নারীদের অত্যন্তাধিক্য। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এটা-সেটা আলাপ করতে করতে অভ মাইস এন্ড মেন-এর কথা উঠতে এক বন্ধু জানাল — স্টাইনবেক তার প্রিয় লেখক, অভ মাইস এন্ড মেন খুব ভালও, কিন্তু তার মতে স্টাইবেকের লেখা গুলির মধ্যে এটা নাকি দুর্বলতম। শুনে ঘাবড়িয়ে গেছি। তাঁর সেরা বই কোনটা জিজ্ঞেস করাতে বন্ধুবর জানাল, ইস্ট অভ ইডেন। চুপ করে শুনলাম, নাড়লাম মাথা। এটা আর জানালাম না যে সেই শিল্পকর্মটির সাথেও আমার পরিচয় আছে, এলায়্যা কাজান আর জেমস ডীন-এর ফিল্মের মাধ্যমে। এ ছোকরা আবার ফিল্মের তেমন ভক্ত নয়।
শেষ।

স্টাইনবেক সরলতা ১

জন স্টাইনবেকের সাথে আমার পরিচয় জন ফোর্ড-এর বরাতে। স্টাইনবেকের বিখ্যাত উপন্যাস গ্রেপ্স অভ র ্যাথ-এর বিখ্যাত চিত্ররূপ দিয়েছিলেন ফোর্ড। এটি আমার সবচেয়ে পছন্দের ফোর্ড-ছবি নয়, সে সম্মান গত বছর খানের ধরে “আমার প্রিয়তমা ক্লেমেন্টাইন” ছবিটিকে দিয়ে আসছি। তবুও জন ফোর্ডের অধিকাংশ চেনা-জানা ছবির মতই, গ্রেপ্স অভ র ্যাথ-এর সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু ফিল্মের সাথে পরিচয় মানে লেখকের সাথে খুব ভাল পরিচয় নয়, বিশেষত ফিল্মমেকার যখন শক্তিশালী, আর বিশেষত যখন ছবি আর ফিল্মের মধ্যে বেশ বেমিল রয়েছে বলে জানা যায়। স্টাইনবেকের সাথে আমার সম্যক পরিচয় ঘটেছে খুব সম্প্রতি একটি বই পড়ে।

নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশনের পাশে একটা বড় বইয়ের দোকান আছে — কাজ না থাকলে, বা থাকলেও, সেখানে মাঝে মাঝে ঘোরাফেরা করি। সেখান থেকেই স্টাইনবেকের একটি বই কিনেছিলাম, বইটার নাম অভ মাইস এন্ড মেন। স্টাইনবেকের এক সারি বইয়ের মধ্যে এটা বাছবার কারণ বইটির বেধ — শ’ খানেক পৃষ্ঠা হবে বড়জোড়। বই পছন্দের অলসতা-সম্ভূত এই কারণটি বলতে লজ্জা পেতে পারতাম, কিন্তু পাচ্ছিনা, কারণ এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বইগুলির অন্যতম।

বড় লেখকের মোটা বই ভাল, না সরু বই? মোটা বই খুব ভালই হতে পারে, তবে কোন বই আছে, যেগুলোতে লেখকের পরিশ্রমের একটা কঠোর ছাপ, ফলে পড়তেও খুব কষ্ট হয়। যেমন, পুলিটজার পুরস্কার বিজয়ী ফিলিপ রথের অ্যামেরিকান প্যাস্টোরাল নামে একটা বই পড়ছিলাম, অর্ধেক পড়ে ছেড়ে দিয়েছি। রথ খুব পরিশ্রমী, তীক্ষ্নবুদ্ধি লেখক সন্দেহ নেই, কিন্তু তার জটিল গদ্য ছোলাসুদ্ধ কাঁঠালের মত আর উদরসাত্ করতে আর পারছিলাম না।

স্টাইনবেকের গদ্য তুলনায় সরল। এভাবে শুরু করছেন তাঁর জাদুকরী গল্প –

সোলেদাদের কয়েক মাইল দক্ষিণে এসে সালিনাস নদী পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে — নদী গভীর, সবুজ। আর তার জল বেশ গরম…

স্টাইনবেকের ইংরেজীতে এই বাক্যদুটির মধ্যে কি যেন আছে আশ্চর্য রসায়ন, বেশ বার কয়েক বার পড়ে আমার মনে হয়েছে বাক্য গঠনের সরলতা প্রথম বাক্যের শেষ অংশের “গভীর” শব্দটার সাথে মিশে এই অভিঘাতটা তৈরি করেছে।

চলবে…

লোলা মন্তেস

লোলা মন্তেস আমি পরপর তিনবার দেখেছি কিছুদিন আগে। প্রথম বার বিস্ময়বোধের তীব্রতার কারণে মুখে তেমন কোন ভাবের প্রকাশ ছিলনা। দ্বিতীয়বারে বেরিয়ে আসার সময় মুখে যে পায়েস-খাওয়া হাসি ছিল, সেটি দেখে বাইরে লাইনে পরের-শো-ধরবার-জন্যে-দাঁড়ানো একজন বললেন, “বাহ, খুশি খুশি সব দর্শক!”। তৃতীয়বার এব্যাপারটায় সচেতন থাকবার চেষ্টাসত্বেও একটা তদ্গত মুগ্ধতার ছাপ এড়ানো সম্ভব হয়নি। নান্দনিক আনন্দের চুড়ান্ত যাকে বলে!

লোলা মন্তেস ছবিটি পঞ্চাশের দশকে বানিয়েছিলেন ম্যাক্স ওফ্যল্স। আমার কাছে ম্যাক্স ওফ্যল্স আর গিরিশ ঘোষ একই, অর্থাত্ তাঁর নাম কারণে-অকারণে অনেক শুনেছি, কিন্তু তাঁর শিল্পকর্মের সাথে কোন পরিচয় ছিলনা। তাছাড়া, ছবিটি একরকম হারিয়ে গিয়েছিল। লোলা মন্তেস বাজারে মার খাবার পরে প্রযোজকেরা ছবিটি রি-এডিট করেছিলেন ইচ্ছেমত — ছবির মাস্টার কপিও বোধহয় আর সুরক্ষিত ছিলনা। দীর্ঘদিন পরে গতবছর ফ্রান্সের সিনেমা আর্কাইভ ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ছবিটি ওফ্যল্স-এর আদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনর্নিমিত করে। নিউ ইয়র্ক ফিল্ম উত্সব ২০০৮-এ লোলা মন্তেস দেখানো হচ্ছিল, কিন্তু অনেক আগে খোঁজ করেও টিকিট পাইনি। এতদিন অপেক্ষা করে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি সিনেমা হলে এক সপ্তাহের জন্য ছবিটি দেখাচ্ছে জেনে দেখতে যেতেই হল।

দেদার বাজনা ও ঝাড়বাতির দৃশ্যটি একটি সার্কাসের, এটা বোঝা গেল যখন হাতে একটা চাবুক নিয়ে সং-পরিবেষ্টিত সার্কাস-মাস্টার ঘোষণা করতে থাকেন রাতের সেরা আকর্ষণ লোলা মন্তেস-এর আগমনবার্তা। মায়াবিনী, সার্কাসের অন্যান্য পশুর চেয়ে বহুগুণে হিংস্র, এবং ইউরোপ মহাদেশের বহু খ্যাত-অখ্যাত পুরুষের মস্তক চর্বণকারিণী — ইত্যাকার বিশেষণ-বিভূষিতা লোলা মন্তেস একটা খোলা ঘোড়া-টানা-ছ্যাকড়া গাড়ি ধরনের জিনিসে চেপে উপস্থিত হলেন। সার্কাসের শো-টি আর কিছুই নয় — লোলার কেচ্ছা-কেলেংকারীর জীবনের কিছুটা আদিরসাত্মক পুনরাভিনয়। পুরো ছবি জুড়ে এটাই চলল, আর ছবি শেষ হল যখন শেষ হল অভিনয় — কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে একটু অবসন্ন লোলার স্মৃতি-চারণের ফ্ল্যাশব্যাক। প্রথম ফ্ল্যাশব্যাক শুরু হচ্ছে রোমান্টিক পিয়ানো বাজনা দিয়ে, তারপর দেখছি গ্রামের পথ ধরে চলেছে ঘোড়ায় টানা বেশ বড় ধরণের একটি গাড়ি। গাড়িটি থামিয়ে গাড়োয়ান নেমে এসে একটা মাইল পোস্ট দেখছেন, আর এর মধ্যে গাড়ির ভেতর থেকে লম্বা দেহ এবং চুলওয়ালা এক ভদ্রলোক গলা বের করেছেন। তাঁকে গাড়োয়ান চিত্কার করে বললেন, “মিস্টার লিস্ত, আর বেশিদূর নয়”! এই পর্যায়ের আমি হেসে ফেলেছিলাম, কারণ আমার কেন যেন ধারণা হয়েছিল ওফ্যল্স রসিকতা করছেন। কিন্তু তার পরেই দেখি, তা নয়, লম্বাচুলো ভদ্রলোক আসলেই সংগীতকার ফ্রানজ লিস্ত, এবং লোলা মন্তেসের অন্যতম ও তত্কালীন প্রণয়ী (গাড়ির ভেতর লোলা অবস্থান করছিলেন)। এই লিস্ত সিকুয়েন্সটি (অন্য সব সিকুয়েন্সের মতই) অসাধারণ, আমরা দেখলাম ইউরোপ বিজয়ী সংগীতশিল্পীর তীব্র আত্মপ্রত্যয় — বললেনও লিস্ত একপর্যায়ে “প্রিয়তমা, আমি ফ্রানজ লিস্ত!” — কিন্তু লোলার প্রায় জান্তব কনফিডেন্সের তুলনায় তা কিছুই নয়। ওফ্যল্স তার কাহিনীটি বলে ফেলছেন প্রথমেই — গর্বিত লোলার পতন কাহিনীই ছবির কাহিনী। এই ঝুঁকি বিরাট ঝুঁকি, গল্প বলার কায়দাটি খুব খাশা না হলে দর্শক অচিরেই আগ্রহ হারাতে বাধ্য।

ওফ্যল্স এর টেকনিক অত্যন্ত সাংগীতিক, এত বেশি যে ছবিটির মধ্যে একটা মিউজিক ভিডিও মিউজিক ভিডিও ভাব পর্যন্ত চলে এসেছে। ক্যামেরার নড়াচড়াকে ওফ্যল্স তবলার সংগতের মত ব্যবহার করেছেন মানবদেহের গড়ন-বলন-চলনের সেতার বাদনের সাথে। আমার সন্দেহ, কাউকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখলেই ওফ্যল্স-এর ভাব-সমাধি হত — একটি ফ্ল্যাশব্যাকে সার্কাস মাস্টারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামার দৃশ্যটি যে সুস্পষ্ট আনন্দের সাথে তুলেছেন পরিচালক, তার পরে আর এ ব্যাপারে সন্দেহ করা চলেনা। অনেক অসাধারণ ছবির দৃশ্য ফটোগ্রাফের মত মনে ছাপ কেটে যায় — কিন্তু লোলা মন্তেসের একটি স্থির ইমেজও আমার মনে পড়ছেনা, শুধু মনে পড়ছে অনেক শটের অপ্রত্যাশিত গতিময়তা — সেই সিঁড়ি বাওয়ার শট, একই সিকুয়েন্সে একটি চুম্বন-দৃশ্য, লোলার হঠাত্ দৌড়ানো, হঠাত্ ঘোড়া ছোটানো, হঠাত্ থেমে যাওয়ার অসংখ্য শট।

ওফ্যল্স-এর সিনেমা শুধু গতিময়তার উপর অবশ্য নির্ভরশীল নয়, কিন্তু তাঁর রসবোধ এবং কিছুটি শীতল মানবতাবোধ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ হতে বাধ্য, এবং দীর্ঘ আলোচনা বিদ্বান দুর্জনের মতই পরিত্যাজ্য। এটুকু বলা যাক যে ছবির শেষ শটে তাঁর সব প্রবণতাকে সংহিত করেছেন ম্যাক্স ওফ্যল্স, এবং সেই শটটিই শ্রেষ্ঠতম।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্ত – তিন

ইতিমধ্যে: চীন এর মাঝখানে কিছুদিন ইউটিউব নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। লে হালুয়া!

বিবিসিকে দেয়ে বিটিআরসি-র চেয়ারম্যানের সাক্ষাত্কারের একটি লিংক নিচে দেয়া গেল, তবে লিংকটি যেমন দেখানোর কথা ঠিক সেরকম দেখাচ্ছেনা কেন যেন। “ট্র্যাক ডিটেইলস”-এ ক্লিক করলে অডিওটি শোনা যাচ্ছে।

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

বিকল্পে সচলায়তনের এই ব্লগের নিচের দিকে এই একই লিংক খুঁজে পাওয়া যাবে।

সাক্ষাত্কারটি একটা মাস্টারপীস, এবং চেকভ এই ডায়লগ লিখতে পারলে গর্ববোধ করতেন, এটা হল আমার মত — কারণ এত অল্প কথায় এত বেশি ভাব প্রকাশ করা খুব কঠিন কাজ। বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জিয়া আহমেদ প্রথম বাক্যেই “জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় সংহতি”-র কথা বলে আমার মেজাজ খিঁচড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু পরের দিকে আমাকে প্রভূত আনন্দ দিতে পেরেছেন। (জনান্তিকে, জাতীয় ঐক্য আর জাতীয় সংহতি দুটিই কেন বলতে হচ্ছে? এদের মধ্যে পার্থক্যটি ঠিক কি?)

চেয়ারম্যানের কিছু অংশ আশ্চর্য রকমের লোকহাসানো, যেমন বিবিসির ভদ্রলোক যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন ইউটিউব-ইস্নিপ্স এ এমন কি ছিল যার কারণে এগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব বলছেন, “আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, এটা তো প্রশ্নের অপেক্ষা রাখেনা পুরো দেশের লোক জানে, এবং আলোচনা হচ্ছে” — হাহাহাহাহাহাহাহা ….. হাহাহাহাহা (ক্লান্ত হয়ে পড়লেম)! এই বাক্যটি কিভাবে উচ্চারণ করা সম্ভব জানিনা। মজা পেয়েছি সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীর প্রতিক্রিয়ায়, তাঁর বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট যে আইরনিটি সম্বন্ধে তিনি পুরোমাত্রায় সচেতন।

সাক্ষাত্কারের এই অংশের পরপরই মন্তব্য করা হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি চেয়ারম্যান তাহলে অস্বীকার করছেন না। চেয়ারম্যান সাহেব সেটি মেনে নিলেন, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি কেন মানুষকে ঠেকে জানতে হল, কেন বিটিআরসি প্রথমেই কেন স্পষ্ট ভাবে সেটি জানিয়ে দেয়নি, এ ব্যাপারটায় কোন দুঃখপ্রকাশ বা সচেতনতাবোধ তাঁর মধ্যে দেখলাম না। ঠিক একই ভাব, সাক্ষাত্কারের পরবর্তী অংশে যখন জিজ্ঞেস করা হল নিষিদ্ধ ওয়েবাঙ্গনগুলির সাথে কোন যোগাযোগ করা হবে কিনা, তখন চেয়ারম্যান নির্বিকার ভাবে জানালেন, প্রয়োজন হলে জানানো হবে। লক্ষ্য করুন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ওয়েবাঙ্গন যারা চালাচ্ছেন কষ্ট করে, উভয়ের অধিকারের ব্যাপারে কি আশ্চর্য অন্ধতা। সাক্ষাত্কারের প্রথম দিকে ওয়েবাঙ্গনগুলির দায়িত্ব সম্বন্ধে লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দেয়া গেল, কিন্তু নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তটি জানবার অধিকারও তাঁদের আছে বলে মনে হলনা। ব্যবহারকারীর অধিকার লংঘনের ব্যাপারটি আরও ভয়াবহ। ইউটিউবে যে ছাত্র ডিএসপি-র লেকচার শুনে নতুন একটি বিষয় শিখছে, যে মা কন্যার জন্মদিনের উত্সবের ভিডিও আপলোড করেছে আত্মীয়-স্বজন দেখবে বলে, এমনকি ছুটির দিনে বসে যে ইউটিউবে বিড়ালের তবলা বাজানোর দৃশ্য দেখে সময় কাটানোর চেষ্টা করছে — তাদের অধিকার মাটিতে ফেলে তার উপর নৃত্যনাট্য যদি করতেই হয়, অন্তত নিজেদের গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের কাছ থেকে সেটি পরিষ্কার ভাবে জানবার প্রত্যাশা তাঁরা করতেই পারেন।

চলবে।

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.