মোবি ডিক
ঠিক মনে করতে পারছিনা কেন, হঠাত্ ঠিক করলাম হারমান মেলভিলের লেখা পড়তে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম তার প্রধান উপন্যাস দুটি — মোবি ডিক, আর বিলি বাড, নাবিক। ঠিক করলাম প্রথমে বিলি বাড পড়ব। এর একটা কারণ এই যে উপন্যাসটি সংক্ষিপ্ততর, মোবি ডিকের ৫০০ পাতার মেদ হজম করাটি কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। বিলি বাড অনেক ছোট, উপন্যাসিকা বললেই হয়।
এই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে প্রত্যেকদিন বিলি বাড খুলে নিতাম বিছানায় শুয়ে, ঘন্টাখানেকের ধস্তাধস্তিতে তিন চার অনুচ্ছেদ পড়তাম, মাথায় কিছুই প্রবেশ করত না — এবং অতিদীর্ঘ গসাগু কষবার সময় যেভাবে খাতার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দাগ ও সংখ্যা ক্রমশ-হ্রস্ব হতে হতে মিলিয়ে যায়, আমার উত্সাহও একই প্রক্রিয়ায় খাট হতে থাকল। যে সংকলনের অংশ ছিল উপন্যাসটি, অনেক কষ্টে সেখান থেকে একটি ছোট গল্প পড়ে নিজের মেলভিল অাগ্রহের সলিল সমাধি দিলাম।
যেটা করা উচিত ছিল, সেটাই করা শুরু করলাম কিছুদিন আগে। মোবি ডিক পড়া শুরু করলাম। মোবি ডিক মেলভিলের প্রধান উপন্যাস, এবং মার্কিন সাহিত্যের মহত্তম মাস্টারপীস-গুলির মধ্যে গণ্য। অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। তিমি মেরে তার তেল বের করে বিক্রি করাটি কয়েক শত বছর যাবত একটা বিরাট ব্যবসা ছিল। ম্যাসাচুসেটস-এর উপকূল থেকে একটি তিমি ধরা জাহাজ এই একই কারণে রওনা দেয়, কিন্তু রওনা দেয়ার পর জাহাজের নাবিক ও শিকারীরা জানতে পারে যে এই যাত্রার উদ্দেশ্যটি একটু ভিন্ন। মোবি ডিক নামে পরিচিত বিশালায়তন, হিংস্র ও অসাধারণ বুদ্ধিমান একটি বিশেষ তিমিকে মারাটাই এই যাত্রার লক্ষ্য, কারণ জাহাজের ক্যপ্টেন এহ্যাব এর আগের এক যাত্রায় এই তিমির হাতে তার পা, কিছু সহযাত্রী এবং মান-সম্মান খুইয়েছেন। সারা পৃথিবীর মহাসাগরগুলিতে ঘুরে এহ্যাবের জাহাজ খুঁজে বেড়াতে থাকে মোবি ডিককে, আর মাঝে মাঝে তাদের দেখা হয় সেই তিমির হাতে পরাজিত অন্য জাহাজের বিষন্ন নাবিকদের সাথে। ভয়ংকর টেনশন! টেনশন আরো বেশি, কারণ মোবি ডিক সুবিখ্যাত হলেও শিকারীরাও কম নয়, জাহাজের অসাধারণ হারপুন ক্ষেপকদের সাথে মেলভিল আমাদের খুব ভাল ভাবেই পরিচয় করিয়ে দেন।
শেষ সীনে কি হয়, সেটা অবশ্যই এখানে বলছিনা। তবে বইটি আবার পড়বার প্রয়োজন বোধ করছি। আমার বদভ্যাস আছে, গোয়েন্দা কাহিনী বা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী প্রথমবার ঠিক রসিয়ে রসিয়ে পড়তে পারিনা — বাসে করে দীর্ঘ যাত্রার পর অনেকক্ষণ চেপে রাখা যাত্রী যেভাবে হালকা হওয়ার জন্য ছুটতে থাকেন, কাহিনীর শেষ জানবার জন্য কিছুটা সেভাবেই অগ্রপশ্চাত না তাকিয়ে এগোতে থাকি। মোবি ডিক তার অ্যাডভেঞ্চার-আবহ সত্বেও সূক্ষ্ম ব্যাপার, অন্তত আরেকবার না পড়লে চলবে না।
উল্লেখ্য, বিলি বাডের যে সমস্যা, মোবি ডিকেও সেটা রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজী গদ্য কঠিন, এবং অতি দীর্ঘ বাক্যে আকীর্ণ, কিন্তু আমার (অল্প) অভিজ্ঞতায় মেলভিলের মত আর কিছুই নয়। তবে মোবি ডিকের করলা খেয়ে সুবিধে হয়েছে, বিলি বাডের নিম আর ততটা অসহ্য মনে হচ্ছেনা। পরশুদিন থেকে আবার ধরেছি বিলি বাড, পাঁচ পাতা পড়েছি।
স্টাইনবেক সরলতা ২
স্টাইনবেক সরলতা ১
জন স্টাইনবেকের সাথে আমার পরিচয় জন ফোর্ড-এর বরাতে। স্টাইনবেকের বিখ্যাত উপন্যাস গ্রেপ্স অভ র ্যাথ-এর বিখ্যাত চিত্ররূপ দিয়েছিলেন ফোর্ড। এটি আমার সবচেয়ে পছন্দের ফোর্ড-ছবি নয়, সে সম্মান গত বছর খানের ধরে “আমার প্রিয়তমা ক্লেমেন্টাইন” ছবিটিকে দিয়ে আসছি। তবুও জন ফোর্ডের অধিকাংশ চেনা-জানা ছবির মতই, গ্রেপ্স অভ র ্যাথ-এর সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু ফিল্মের সাথে পরিচয় মানে লেখকের সাথে খুব ভাল পরিচয় নয়, বিশেষত ফিল্মমেকার যখন শক্তিশালী, আর বিশেষত যখন ছবি আর ফিল্মের মধ্যে বেশ বেমিল রয়েছে বলে জানা যায়। স্টাইনবেকের সাথে আমার সম্যক পরিচয় ঘটেছে খুব সম্প্রতি একটি বই পড়ে।
নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশনের পাশে একটা বড় বইয়ের দোকান আছে — কাজ না থাকলে, বা থাকলেও, সেখানে মাঝে মাঝে ঘোরাফেরা করি। সেখান থেকেই স্টাইনবেকের একটি বই কিনেছিলাম, বইটার নাম অভ মাইস এন্ড মেন। স্টাইনবেকের এক সারি বইয়ের মধ্যে এটা বাছবার কারণ বইটির বেধ — শ’ খানেক পৃষ্ঠা হবে বড়জোড়। বই পছন্দের অলসতা-সম্ভূত এই কারণটি বলতে লজ্জা পেতে পারতাম, কিন্তু পাচ্ছিনা, কারণ এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বইগুলির অন্যতম।
বড় লেখকের মোটা বই ভাল, না সরু বই? মোটা বই খুব ভালই হতে পারে, তবে কোন বই আছে, যেগুলোতে লেখকের পরিশ্রমের একটা কঠোর ছাপ, ফলে পড়তেও খুব কষ্ট হয়। যেমন, পুলিটজার পুরস্কার বিজয়ী ফিলিপ রথের অ্যামেরিকান প্যাস্টোরাল নামে একটা বই পড়ছিলাম, অর্ধেক পড়ে ছেড়ে দিয়েছি। রথ খুব পরিশ্রমী, তীক্ষ্নবুদ্ধি লেখক সন্দেহ নেই, কিন্তু তার জটিল গদ্য ছোলাসুদ্ধ কাঁঠালের মত আর উদরসাত্ করতে আর পারছিলাম না।
স্টাইনবেকের গদ্য তুলনায় সরল। এভাবে শুরু করছেন তাঁর জাদুকরী গল্প –
সোলেদাদের কয়েক মাইল দক্ষিণে এসে সালিনাস নদী পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে — নদী গভীর, সবুজ। আর তার জল বেশ গরম…
স্টাইনবেকের ইংরেজীতে এই বাক্যদুটির মধ্যে কি যেন আছে আশ্চর্য রসায়ন, বেশ বার কয়েক বার পড়ে আমার মনে হয়েছে বাক্য গঠনের সরলতা প্রথম বাক্যের শেষ অংশের “গভীর” শব্দটার সাথে মিশে এই অভিঘাতটা তৈরি করেছে।
চলবে…
লোলা মন্তেস
লোলা মন্তেস আমি পরপর তিনবার দেখেছি কিছুদিন আগে। প্রথম বার বিস্ময়বোধের তীব্রতার কারণে মুখে তেমন কোন ভাবের প্রকাশ ছিলনা। দ্বিতীয়বারে বেরিয়ে আসার সময় মুখে যে পায়েস-খাওয়া হাসি ছিল, সেটি দেখে বাইরে লাইনে পরের-শো-ধরবার-জন্যে-দাঁড়ানো একজন বললেন, “বাহ, খুশি খুশি সব দর্শক!”। তৃতীয়বার এব্যাপারটায় সচেতন থাকবার চেষ্টাসত্বেও একটা তদ্গত মুগ্ধতার ছাপ এড়ানো সম্ভব হয়নি। নান্দনিক আনন্দের চুড়ান্ত যাকে বলে!
লোলা মন্তেস ছবিটি পঞ্চাশের দশকে বানিয়েছিলেন ম্যাক্স ওফ্যল্স। আমার কাছে ম্যাক্স ওফ্যল্স আর গিরিশ ঘোষ একই, অর্থাত্ তাঁর নাম কারণে-অকারণে অনেক শুনেছি, কিন্তু তাঁর শিল্পকর্মের সাথে কোন পরিচয় ছিলনা। তাছাড়া, ছবিটি একরকম হারিয়ে গিয়েছিল। লোলা মন্তেস বাজারে মার খাবার পরে প্রযোজকেরা ছবিটি রি-এডিট করেছিলেন ইচ্ছেমত — ছবির মাস্টার কপিও বোধহয় আর সুরক্ষিত ছিলনা। দীর্ঘদিন পরে গতবছর ফ্রান্সের সিনেমা আর্কাইভ ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ছবিটি ওফ্যল্স-এর আদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনর্নিমিত করে। নিউ ইয়র্ক ফিল্ম উত্সব ২০০৮-এ লোলা মন্তেস দেখানো হচ্ছিল, কিন্তু অনেক আগে খোঁজ করেও টিকিট পাইনি। এতদিন অপেক্ষা করে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি সিনেমা হলে এক সপ্তাহের জন্য ছবিটি দেখাচ্ছে জেনে দেখতে যেতেই হল।
দেদার বাজনা ও ঝাড়বাতির দৃশ্যটি একটি সার্কাসের, এটা বোঝা গেল যখন হাতে একটা চাবুক নিয়ে সং-পরিবেষ্টিত সার্কাস-মাস্টার ঘোষণা করতে থাকেন রাতের সেরা আকর্ষণ লোলা মন্তেস-এর আগমনবার্তা। মায়াবিনী, সার্কাসের অন্যান্য পশুর চেয়ে বহুগুণে হিংস্র, এবং ইউরোপ মহাদেশের বহু খ্যাত-অখ্যাত পুরুষের মস্তক চর্বণকারিণী — ইত্যাকার বিশেষণ-বিভূষিতা লোলা মন্তেস একটা খোলা ঘোড়া-টানা-ছ্যাকড়া গাড়ি ধরনের জিনিসে চেপে উপস্থিত হলেন। সার্কাসের শো-টি আর কিছুই নয় — লোলার কেচ্ছা-কেলেংকারীর জীবনের কিছুটা আদিরসাত্মক পুনরাভিনয়। পুরো ছবি জুড়ে এটাই চলল, আর ছবি শেষ হল যখন শেষ হল অভিনয় — কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে একটু অবসন্ন লোলার স্মৃতি-চারণের ফ্ল্যাশব্যাক। প্রথম ফ্ল্যাশব্যাক শুরু হচ্ছে রোমান্টিক পিয়ানো বাজনা দিয়ে, তারপর দেখছি গ্রামের পথ ধরে চলেছে ঘোড়ায় টানা বেশ বড় ধরণের একটি গাড়ি। গাড়িটি থামিয়ে গাড়োয়ান নেমে এসে একটা মাইল পোস্ট দেখছেন, আর এর মধ্যে গাড়ির ভেতর থেকে লম্বা দেহ এবং চুলওয়ালা এক ভদ্রলোক গলা বের করেছেন। তাঁকে গাড়োয়ান চিত্কার করে বললেন, “মিস্টার লিস্ত, আর বেশিদূর নয়”! এই পর্যায়ের আমি হেসে ফেলেছিলাম, কারণ আমার কেন যেন ধারণা হয়েছিল ওফ্যল্স রসিকতা করছেন। কিন্তু তার পরেই দেখি, তা নয়, লম্বাচুলো ভদ্রলোক আসলেই সংগীতকার ফ্রানজ লিস্ত, এবং লোলা মন্তেসের অন্যতম ও তত্কালীন প্রণয়ী (গাড়ির ভেতর লোলা অবস্থান করছিলেন)। এই লিস্ত সিকুয়েন্সটি (অন্য সব সিকুয়েন্সের মতই) অসাধারণ, আমরা দেখলাম ইউরোপ বিজয়ী সংগীতশিল্পীর তীব্র আত্মপ্রত্যয় — বললেনও লিস্ত একপর্যায়ে “প্রিয়তমা, আমি ফ্রানজ লিস্ত!” — কিন্তু লোলার প্রায় জান্তব কনফিডেন্সের তুলনায় তা কিছুই নয়। ওফ্যল্স তার কাহিনীটি বলে ফেলছেন প্রথমেই — গর্বিত লোলার পতন কাহিনীই ছবির কাহিনী। এই ঝুঁকি বিরাট ঝুঁকি, গল্প বলার কায়দাটি খুব খাশা না হলে দর্শক অচিরেই আগ্রহ হারাতে বাধ্য।
ওফ্যল্স এর টেকনিক অত্যন্ত সাংগীতিক, এত বেশি যে ছবিটির মধ্যে একটা মিউজিক ভিডিও মিউজিক ভিডিও ভাব পর্যন্ত চলে এসেছে। ক্যামেরার নড়াচড়াকে ওফ্যল্স তবলার সংগতের মত ব্যবহার করেছেন মানবদেহের গড়ন-বলন-চলনের সেতার বাদনের সাথে। আমার সন্দেহ, কাউকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখলেই ওফ্যল্স-এর ভাব-সমাধি হত — একটি ফ্ল্যাশব্যাকে সার্কাস মাস্টারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামার দৃশ্যটি যে সুস্পষ্ট আনন্দের সাথে তুলেছেন পরিচালক, তার পরে আর এ ব্যাপারে সন্দেহ করা চলেনা। অনেক অসাধারণ ছবির দৃশ্য ফটোগ্রাফের মত মনে ছাপ কেটে যায় — কিন্তু লোলা মন্তেসের একটি স্থির ইমেজও আমার মনে পড়ছেনা, শুধু মনে পড়ছে অনেক শটের অপ্রত্যাশিত গতিময়তা — সেই সিঁড়ি বাওয়ার শট, একই সিকুয়েন্সে একটি চুম্বন-দৃশ্য, লোলার হঠাত্ দৌড়ানো, হঠাত্ ঘোড়া ছোটানো, হঠাত্ থেমে যাওয়ার অসংখ্য শট।
ওফ্যল্স-এর সিনেমা শুধু গতিময়তার উপর অবশ্য নির্ভরশীল নয়, কিন্তু তাঁর রসবোধ এবং কিছুটি শীতল মানবতাবোধ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ হতে বাধ্য, এবং দীর্ঘ আলোচনা বিদ্বান দুর্জনের মতই পরিত্যাজ্য। এটুকু বলা যাক যে ছবির শেষ শটে তাঁর সব প্রবণতাকে সংহিত করেছেন ম্যাক্স ওফ্যল্স, এবং সেই শটটিই শ্রেষ্ঠতম।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্ত – তিন
ইতিমধ্যে: চীন এর মাঝখানে কিছুদিন ইউটিউব নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। লে হালুয়া!
বিবিসিকে দেয়ে বিটিআরসি-র চেয়ারম্যানের সাক্ষাত্কারের একটি লিংক নিচে দেয়া গেল, তবে লিংকটি যেমন দেখানোর কথা ঠিক সেরকম দেখাচ্ছেনা কেন যেন। “ট্র্যাক ডিটেইলস”-এ ক্লিক করলে অডিওটি শোনা যাচ্ছে।
|
বিকল্পে সচলায়তনের এই ব্লগের নিচের দিকে এই একই লিংক খুঁজে পাওয়া যাবে।
সাক্ষাত্কারটি একটা মাস্টারপীস, এবং চেকভ এই ডায়লগ লিখতে পারলে গর্ববোধ করতেন, এটা হল আমার মত — কারণ এত অল্প কথায় এত বেশি ভাব প্রকাশ করা খুব কঠিন কাজ। বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জিয়া আহমেদ প্রথম বাক্যেই “জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় সংহতি”-র কথা বলে আমার মেজাজ খিঁচড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু পরের দিকে আমাকে প্রভূত আনন্দ দিতে পেরেছেন। (জনান্তিকে, জাতীয় ঐক্য আর জাতীয় সংহতি দুটিই কেন বলতে হচ্ছে? এদের মধ্যে পার্থক্যটি ঠিক কি?)
চেয়ারম্যানের কিছু অংশ আশ্চর্য রকমের লোকহাসানো, যেমন বিবিসির ভদ্রলোক যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন ইউটিউব-ইস্নিপ্স এ এমন কি ছিল যার কারণে এগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব বলছেন, “আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, এটা তো প্রশ্নের অপেক্ষা রাখেনা পুরো দেশের লোক জানে, এবং আলোচনা হচ্ছে” — হাহাহাহাহাহাহাহা ….. হাহাহাহাহা (ক্লান্ত হয়ে পড়লেম)! এই বাক্যটি কিভাবে উচ্চারণ করা সম্ভব জানিনা। মজা পেয়েছি সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীর প্রতিক্রিয়ায়, তাঁর বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট যে আইরনিটি সম্বন্ধে তিনি পুরোমাত্রায় সচেতন।
সাক্ষাত্কারের এই অংশের পরপরই মন্তব্য করা হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি চেয়ারম্যান তাহলে অস্বীকার করছেন না। চেয়ারম্যান সাহেব সেটি মেনে নিলেন, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি কেন মানুষকে ঠেকে জানতে হল, কেন বিটিআরসি প্রথমেই কেন স্পষ্ট ভাবে সেটি জানিয়ে দেয়নি, এ ব্যাপারটায় কোন দুঃখপ্রকাশ বা সচেতনতাবোধ তাঁর মধ্যে দেখলাম না। ঠিক একই ভাব, সাক্ষাত্কারের পরবর্তী অংশে যখন জিজ্ঞেস করা হল নিষিদ্ধ ওয়েবাঙ্গনগুলির সাথে কোন যোগাযোগ করা হবে কিনা, তখন চেয়ারম্যান নির্বিকার ভাবে জানালেন, প্রয়োজন হলে জানানো হবে। লক্ষ্য করুন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ওয়েবাঙ্গন যারা চালাচ্ছেন কষ্ট করে, উভয়ের অধিকারের ব্যাপারে কি আশ্চর্য অন্ধতা। সাক্ষাত্কারের প্রথম দিকে ওয়েবাঙ্গনগুলির দায়িত্ব সম্বন্ধে লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দেয়া গেল, কিন্তু নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তটি জানবার অধিকারও তাঁদের আছে বলে মনে হলনা। ব্যবহারকারীর অধিকার লংঘনের ব্যাপারটি আরও ভয়াবহ। ইউটিউবে যে ছাত্র ডিএসপি-র লেকচার শুনে নতুন একটি বিষয় শিখছে, যে মা কন্যার জন্মদিনের উত্সবের ভিডিও আপলোড করেছে আত্মীয়-স্বজন দেখবে বলে, এমনকি ছুটির দিনে বসে যে ইউটিউবে বিড়ালের তবলা বাজানোর দৃশ্য দেখে সময় কাটানোর চেষ্টা করছে — তাদের অধিকার মাটিতে ফেলে তার উপর নৃত্যনাট্য যদি করতেই হয়, অন্তত নিজেদের গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের কাছ থেকে সেটি পরিষ্কার ভাবে জানবার প্রত্যাশা তাঁরা করতেই পারেন।
চলবে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্থ – দুই
ইতিমধ্যে: ইউ-টিউব থেকে ব্যান তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্য ওয়েবাঙ্গনগুলি এখনও বাধাগ্রস্থ কিনা সেটি স্পষ্ট নয়।
এই ব্যান সম্বন্ধে দুটি প্রশ্ন। এক, এটা যদি ঠিক হয়ে থাকে যে এই রেকর্ডিং প্রচারের ফলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন, তাহলে ইউ-টিউব প্রভৃতি নিষিদ্ধ করে রেকর্ডিং-টির প্রচার রোধ এবং বহুমূল্য সংহতি রক্ষায় সুবিধে হয়েছে কিনা। দ্বিতীয়ত, আদৌ এই রেকর্ডিং-এর প্রকাশের সাথে জাতীয় ঐক্যের কোন সম্বন্ধ আছে কিনা। প্রথম প্রশ্নটার জবাব খুব সোজা। রেকর্ডিং-টির প্রচার রোধে ইউটিউব ইত্যাদি ব্যান করা একটি প্রহসনে পর্যবসিত হয়েছে। প্রথমত, ইন্টারনেটে তথ্য আদান-প্রদান রোধ করা অত্যন্ত কঠিন। আগেই উল্লেখ করেছি, সরাসরি ইমেইল মারফত এই রেকর্ডিং ছড়িয়েছে, সেটি বন্ধ করা অসম্ভব বললেই চলে। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনাটি নিজেই একটু ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এবং বাংলা ব্লগজগতে তো বটেই, বিবিসি সহ বহু বিদেশী মাধ্যমে জিনিসটি ছড়িয়ে পড়ায় আগে যারা জানতেন না তারাও অনেকে এখন ব্যাপারটি জেনে গেছেন।
গেল। এবার দ্বিতীয় প্রসঙ্গ। রেকর্ডিং-টিতে তেমন গোপন কোন কথা উল্লেখ করা হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোন এমন কোন তথ্য (উদাহরণ স্বরূপ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভবিষ্যত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা) এখানে আলোচিত হয়নি যার প্রচার বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হতে পারে। সেনা অফিসাররা যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলির সবই সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে, অনেক সময় প্রাক্তন এমনকি বর্তমান সেনা সদস্যরাই তা করেছেন। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? একটা কারণ হতে পারে, সভার উত্তেজনার আবহ — সেনাসদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে উচ্চকণ্ঠে কথাবার্তা বলেছেন সেটিকে কোন কারণে সংহতি-সংহারক বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এটা গ্রহণযোগ্য নয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তাঁর সিদ্ধান্ত সরাসরি সেনাসদ্স্যদের প্রভাবিত করে, আর পিলখানা ঘটনায় তো বটেই — কাজেই এ ব্যাপারে তাঁরা উত্তেজিত, ক্ষুব্ধ এবং চিত্কৃত না হলেই আমি বাংলাদেশের ঐক্য (এবং গণতন্ত্র) সম্বন্ধে চিন্তিত হয়ে পড়তাম। সেনাবাহিনীর চেইন অভ কম্যান্ড ইত্যাদি ব্যাপার সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা নেই, কিন্তু এমন যদি হয়ে থাকে যেই এই সভায় সেনাবাহিনীর কোন আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, তাহলে সেই তথ্য দেশশুদ্ধ লোকের কাছে গোপন করে লাভ কি? আর তাছাড়া, যাঁরা প্রশ্ন করছিলেন তাঁদেরকে সঙ্গতভাবেই প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ মনে হলেও একেবারে শৃঙ্খলা-বিবর্জিত কিন্তু মনে হয়নি।
আগামী (এবং শেষ) পর্বে বিটিআরসি-র চেয়ারম্যানের সাক্ষাত্কার নিয়ে আলোচনা করব। এটা করব, কারণ তাঁর মন্তব্যগুলিতে যে মনোভাবকে বলা যায় “ক্ষমতাসীনের দৃষ্টিকোণ”, সেটা প্রকাশ পেয়েছে — এবং এই আধা-মধ্যযুগীয় মনোভাব দূর না হলে বাংলাদেশে মুক্তমাধ্যমের ভবিষ্যত আলোকিত নয়।
চলবে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্থ – এক
কিছুদিন আগে সচলায়তন ওয়েবাঙ্গনে যোগাযোগ বন্ধ করার প্রেক্ষিতে একটা ব্লগ লিখেছিলাম। সচলায়তন বিষয়ক ঘটনাটির সাথে এবারকারটির পার্থক্য আছে, সেটা প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার। সচলায়তনের ঘটনাটি ছিল বিশুদ্ধ বাক-স্বাধীনতার ইস্যু। এবারের নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারটি কিছুটা তাই, কিন্তু এখানে একটা প্রাইভেসি ইস্যুও আছে। প্রধানমন্ত্রী, সেনাপতি কি কৃষিজীবি — সব মানুষেরই প্রাইভেসীর অধিকার আছে, বা অন্তত থাকা উচিত (এ বিষয়ে আইন-কানুন কি আছে সেটা অামি পরিষ্কার ভাবে জানিনা)। এটা ঠিকই যে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের গুরুত্বপূরণ পদাধিকারীদের প্রাইভেসী সংগত ভাবেই কিছুটা কম, অনেকটা সময়ই তারা সাংবাদিক বা জনসাধারণের সামনে কাটান, এবং বহু বিষয়ে, ব্যক্তিগত বিষয় সহ, মানুষ তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা আশা করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রাইভেসী বলে তাদের কিছু নেই। নিজের সহকর্মী, সহকারী, সেনা সদস্য বা অন্য যে কারো সাথেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অধিকার শেখ হাসিনার রয়েছে। সত্যি বলতে কি, প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বিশ্রীভাবে যাদের প্রাইভেসী এখানে লংঘিত হয়েছে তাঁরা হলেন অপেক্ষাকৃত নিম্ন পদাধিকারী সেনা কর্মকর্তারা। একটি গোপন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা কি বলেছেন না বলেছেন সেটা এখন প্রকাশ পেয়ে গেল, এবং এ তথ্য পরবর্তীতে তাঁদের পক্ষে-বিপক্ষে কিভাবে ব্যবহৃত হবে তা কেউ বলতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, পরবর্তীতে এধরণের “রুদ্ধদ্বার” কিন্তু সম্ভবত মুক্ত-মোবাইল সভায় কেউ মন খুলে কথা বলবেন কিনা, সেটাও দ্বিধার সম্মুখীন হয়ে পড়ল। এসবই অতি দুঃখজনক, এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ সংগত বইকি।
কিন্তু বিটিআরসি-র অপকর্মটি প্রাইভেসী ধামার নিচে চাপা দেয়ার নয়। প্রথমত, নিজেদের স্বপক্ষে তারা এধরণের কোন যুক্তি খাড়া করেনি। বিটিআরসি-র চেয়ারম্যান বলেছেন, ইউটিউব ইত্যাদি বন্ধ করা হয়েছে “জাতীয় ঐক্য ও সংহতি”-র স্বার্থে (তাঁর উদ্ভট সাক্ষাত্কার নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব)। দ্বিতীয়ত, এই রেকর্ডিং প্রকাশের ফলে যাঁদের প্রাইভেসি লংঘিত হয়েছে, তাঁরা প্রতিবাদ-মামলা যা করার নিজেরাই করতে পারেন, তার জন্য বিটিআরসি-র আগ বাড়িয়ে দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন পড়েনা। আর পাঁচজনের লোকের ব্যক্তিগত কথোপকথন যদি ইউটিউবে আপলোড হয়ে গিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও বিটিআরসি একই কাজ করবে কি? যদি না করে, তাহলে ব্যক্তিগত প্রাইভেসীর বিষয়টি তাদের পক্ষের যুক্তি হিসেবে অবান্তর। তাঁদের যে যুক্তি, “জাতীয় ঐক্য ও সংহতি” সেটিকেই তাহলে ভালভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
চলবে।
হাডসনের ধারে বাড়ি ২
দেশের প্রেসিডেন্টের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা দরকার, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার মল্লযোদ্ধা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু রাজনীতি অদ্ভুত জীব। ইতিহাস ও প্রাক-ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে নেতা হিসেবে বলবান বল্লম-কুড়াল-তলোয়ার ধারী সেনাপতি শ্রেণীর লোকদের দেখার ফলেই হোক, আর যে কারণেই হোক, প্রেসিডেন্টদের শুধু বুদ্ধিমান, স্থিতধী ও সুস্থ হলেই চলেনা, রীতিমত দৌড়ঝাঁপ করে না দেখালে তার প্রতি ঠিক আস্থা আসেনা। ১৯২০-এর দশকে ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট পোলিও আক্রান্ত হয়ে কোমর থেকে নীচের দিকে সম্পূর্ণ অশক্ত হয়ে পড়েন। এই তথ্য লুকোনোর জন্য রীতিমত কসরত করতে হয়েছে তাঁকে। লোহার একটা খাঁচা পায়ে মুড়ি দিয়ে কোন মতে লোক সমক্ষে দু-এক পা হাঁটতে পারতেন। তামাটে রংয়ের সেই খাঁচা জাদুঘরে দেখে টার্মিনেটরের ঠ্যাং বলে সন্দেহ হচ্ছিল। হাঁটার কষ্টকর অভিনয় বা গাড়িতে চড়ার সময়টা ছড়া অধিকাংশ সময় বসে থাকতেন একটা হুইল-চেয়ারে। বাড়ির লাইব্রেরীতে এমন একটি হুইল চেয়ার রাখা ছিল — আমাদের গাইড জানালেন যে পায়ের ওপর চাদর এমন ভাবে রাখতেন রুজভেল্ট যে চেয়ারটি যে হুইল চেয়ার সেটা অতিথিদের বোঝবার কোন উপায় থাকত না। এসব দেখেশুনে দোতলায় উঠে এক প্রান্তে একটা লিফট দেখলাম। দোতলা বাড়ির নীচতলা থেকে ওপরে সিঁড়ি বেয়ে যেহেতু উঠতে পারতেন না, কাঠের একটা লিফট ছিল রুজভেল্টের ব্যবহারের জন্য। গাইড যখন জানালেন যে এই লিফট তড়িত্চালিত নয়, হাতে দড়ি টেনে হুইলচেয়ার সুদ্ধ নিজেকে রুজভেল্ট টেনে তুলতেন এই লিফটে করে, তখন মনে হল তার কোমর-পায়ের সমস্যা লুকোনোর জন্য ভদ্রলোক এত কসরত না করলেও পারতেন। এই লিফট টেনে তোলার একটি ভিডিও বাজারে ছাড়লেই অন্য কিছুর প্রয়োজন পড়ত না, মার্কিন জনগণ তো আশ্বস্ত হতই, স্টালিনের সাথে পূর্ব ইউরোপ নিয়ে দর কষাকষিটাও হয়ত সহজ হয়ে যেত।
শেষ।
হাডসনের ধারে বাড়ি ১
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বগ্রহণের অনুষ্ঠানটি জানুয়ারির ২০ তারিখে নিয়ম করে ঘটে থাকে, ফলে এসময়টায় ঐতিহাসিক, বর্তমান ও নিকটবর্তী, সব ধরণের প্রেসিডেন্টদের নিয়েই আগ্রহ বেশ বেড়ে যায়। নানান ধরণের ব্যবসা-বাণিজ্যও তুঙ্গে ওঠে — “প্রেসিডেন্ট ওবামার সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি আঁকা এই চিনেমাটির থালাটি আপনি কিনতে পারেন মাত্র ২০ ডলারে। তবে আগামী ২০ মিনিটের মধ্যে অর্ডার দিলে বিনি পয়সায় আরো পাবেন থালাটি রাখবার একটি স্ট্যান্ড এবং প্রেসিডেন্ট ওবামার সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি আঁকা একটি রুমাল”। প্রেসিডেন্টদের জীবনী প্রকাশ এবং পুনঃপ্রকাশের হিড়িক পড়ে — ওয়াশিংটন, জেফারসন, অ্যাডামস প্রমূখ মহারথীরা তো আছেনই, অপেক্ষাকৃত কম জানারাও একটু বেশি জানা হতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি সম্বলিত কোন কিছু কিনবার ইচ্ছা যদিও স্বপ্নেও পোষণ করিনি, তবুও এই রাষ্ট্রপতিক উত্সবে যোগদান করাটা ঘটেই গেছে, কারণ বেশ অদ্ভুতভাবে গত মাসে শ্রেষ্ঠ দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাড়ি বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে।
উত্তর থেকে বয়ে নিউইয়র্ক শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাডসন এক সুরারোপিত নদ — বসন্তে, গ্রীষ্মে এবং গ্রীষ্মান্ত হেমন্তে তার সৌন্দর্য অনন্তপ্রসারী। হাডসনের পূবধার দিয়ে একটি ট্রেন চলে, নিউইয়র্ক শহর থেকে উত্তরে যাওয়ার সময় যখন ট্রেনটি হাডসন ডানে রেখে চলে, তখন মানুষজন ডান দিকের সীটগুলিতে ঠেসে বসে, তাদের চোখ জানালার দিকে ঘোরানো। নিউইয়র্কে ফেরবার সময় সেই একই ট্রেনের ডানের সীট-জানালা ফাঁকা, একটু দেরি করে বা শেষ দিকের স্টেশনে যারা ওঠে, তারাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বামের সীটের কোনটি বসে পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই, গত দু-এক শতাব্দীতে এতদঞ্চলের যারা বনেদী ধনী, তাদের অনেকেরই এ নদীর ধারে এক খানা ম্যানশন জাতীয় বাড়ি আছে বা ছিল। হাইড পার্ক শহরে এমন একটা বাড়িতে জন্মেছিলেন ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ তম রাষ্ট্রপতি। রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, এই পরিচয়েই সম্ভবত তিনি বিশ্বব্যপী পরিচিত, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মার্কিন রাজনীতিতে তার প্রভাব অন্য যেকোন রাষ্ট্রপতির চেয়েই গভীর। গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সময় ক্ষমতা নিয়েছিলেন, বিখ্যাত একাধিক বক্তৃতায় আশ্বস্ত করেছিলেন জনগণকে, এবং অতি দ্রুতগতিতে এমন অনেক অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাদের সত্যিকারের সারতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনমনে উত্সাহ সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা এবং পরবর্তী মার্কিন অর্থনৈতিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক নেই।
রুজভেল্টের এই বাড়ির চারদিকে ছ’শ একরের ঘাসের মাঠ, পাইনের বাগিচা, জাপানী মেপল আর গোলাপের বাগান, স্বচ্ছ ঝরনা, আর রুজভেল্ট আর তাঁর স্ত্রীর সমাধি। রুজভেল্টের পিতামহের আমল থেকেই পরিবারটি ধনশালী, যদিও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দরিদ্রের বন্ধু জাতীয় একটা খ্যাতিই রয়েছে রুজভেল্টের। বাড়ির পাশেই তাঁর নামাঙ্কিত লাইব্রেরী আর জাদুঘর। সত্যি বলতে কি, জাদুঘরটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ছিল। রুজভেল্টের প্রেসিডেন্সীর প্রথম ১০০ দিনের ওপর বিশেষ একটা প্রদর্শনী চলছিল — দেখলাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তৃতার ভিডিও, তাঁর প্রথম এবং বিখ্যাত রেডিও ভাষণ, সেই ভাষণ শুনে মার্কিন জনগণের লেখা চিঠিপত্র, ও সময়কার সংবাদপত্র, কার্টুন, আরো অনেক কিছু। তুলনায় বাড়িটি বাড়িই মাত্র, ঘর, বিছানা, রান্না ঘর, বসার ঘর। তারপরও কোন ঘরে ইংল্যান্ডের রাণী এসে ছিলেন, কোন বিছানায় ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের জন্ম হয়েছিল সেসব দেখে ভালই লাগল।
চলবে…
পাথরে খোদাই চিহ্ন ২
ডব্লিউ. ড্যানিয়েল হিলিস-এর লেখা এই বইটির নয় অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম দুটি অধ্যায়কে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তিভূমিটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, অর্থাৎ কম্পিউটারের মূল যে বুল প্রবর্তিত যুক্তিবিদ্যা এবং মহামতি শ্যানন (”মহামতি”-র ব্যবহার, এই এক ক্ষেত্রে, মোটেও ইয়ার্কি নয়)-কৃত সেই যুক্তির প্রাযুক্তিক রূপদানের পদ্ধতি — হিলিস এসব নিজস্ব কায়দায় বর্ণনা করেছেন। তারপরের অধ্যায়টির নাম প্রোগ্রামিং, স্বাভাবিক ভাবেই প্রোগ্রামিং ভাষার একটা সহজ উদাহরণ খাড়া করা হয়েছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ফন নয়মান স্থাপত্য নামে কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত কাঠামোর বর্ণনা সঙ্গত ভাবেই চলে এসেছে, কারণ এই স্থাপত্যের সাথে আধুনিক প্রায় সব প্রোগ্রামিং ভাষারই নাড়ির যোগ। চতুর্থ অধ্যায়টি টুরিং মেশিন বিষয়ক, যেটি কম্পিউটার বিজ্ঞানের সবচেয়ে “দার্শনিক” অংশ। এরপর আলগরিদম তত্বের জন্য একটি অধ্যায়, তথ্য তত্ব এবং ক্রিপটোগ্রাফীর জন্য একটি অধ্যায় এবং সমান্তরাল কম্পিউটিং-এর উপর একটি অধ্যায়। শেষের দিকের দুটি অধ্যায়ের লেখক ফিরে এসেছেন আবার কিছুটা টুরিং-জগতে (বারবার “মহামতি” বলাটা কেমন দেখায়, নইলে টুরিং-এর নামের আগেও এটি জুড়ে দেয়া যেত)। কম্পিউটারের পক্ষে কিছু “শেখা” সম্ভব কিনা, এই প্রশ্নটি এসেছে অষ্টম অধ্যায়ে। শেষ অধ্যায়ের নাম “প্রযুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে”, যেখানে ওই শেখার প্রশ্নটি, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নটি নিয়ে তাঁর নিজস্ব দর্শন ও চিন্তাভাবনা হিলিস লিখেছেন।
এই বইয়ের যে উদ্দেশ্য, সেটি সফল হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে ঠিক মত কিছু বলতে পারার ব্যাপারে দুটি সমস্যা। একটা আমার সমস্যা, দ্বিতীয়টি সমস্যাটা কম্পিউটার বিজ্ঞানেরই। দ্বিতীয় সমস্যাটা আগে। সব বিষয় আসলে সহজ ভাষায় সমান ভাবে প্রকাশ করা সহজ নয়, এবং এর সাথে বিষয়টি গুরুত্ব বা সৌন্দর্যের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। এর উদাহরণ এমন দুটি ধ্রুপদী বিষয় দিয়ে দেয়া যাক, যাদের গুরুত্ব নিয়ে কারো সন্দেহ থাকবার কথা নয় — পদার্থবিদ্যা এবং গণিত। পদার্থবিদ্যা নিয়ে যে ব্রিফ হিস্ট্রি অভ টাইম জাতীয় জনপ্রিয় বই লেখা সম্ভব, তার কারণ পদার্থবিদ্যার সমস্যাগুলিকে প্রায় মানবিক নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব — আপনি যদি প্রায় আলোর গতিতে চলতে থাকেন তাহলে আপনার বয়স বাড়বেই না প্রায়, তবে সাবধান, এই করতে গিয়ে কোন ব্ল্যাক হোলে পড়ে যাবেননা যেন, একবার ঢুকলে আর বেরোনো অসম্ভব! তুলনায়, মাথা খুটলেও অ্যালজেবরার মৌলিক তত্ব, বা ফাংশনাল বিশ্লেষণের স্পেকট্রাল তত্ব, বা গালোয়া তত্বের এধরণের বর্ণনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় — বা হয়ত পদার্থবিদ্যা মারফত কিছুটা সম্ভব, তবে সেটা আসল জিনিস হলনা মোটেই। কম্পিউটার বিজ্ঞানের অপ্রাযুক্তিক অংশের, এমনকি প্রাযুক্তিক অংশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
প্রথম সমস্যাটি হল, এই বইটি কম্পিউটার-বিষয়ে-তেমন-জানেন-না, এমন আরো কাছে কতটা আকর্ষণীয় হবে, সেটা আমার পক্ষে বলতে যাওয়াটাই অনধিকার-চর্চা। এটা আগে বুঝতে পারলে কি করতাম বলা কঠিন, কিন্তু এতদূর এসে একটু চেষ্টা করতেই হয়। বইটিতে বেশ কিছু ছবি আছে, কিন্তু আরো থাকলে ভাল হত। অনেক অংশ মনে হয়েছে অতিরিক্ত গদ্যময়, বিশেষত কম্পিউটার স্থাপত্যের অংশগুলি ছবি দিয়ে আরো সহজে ব্যাখ্যা করা যেত। আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশ জটিল কিছু প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যেসব প্রশ্ন এ বইয়ের সাধারণ পাঠকের মনে উদয় হবে কিনা সন্দেহ। যেমন, টুরিং মেশিন-এর উপর অধ্যায়টির প্রথম দিকটা। হিলিস টুরিং-এর বিস্ময়কর ঘোষণার বর্ণনার দিয়েছেন মাত্র, এবং এও লিখেছেন যে ইচ্ছে করলে টুরিং প্রতিজ্ঞার এমন অর্থ করা যায় যে মানব-মনও একটা টুরিং মেশিন বা কম্পিউটার। ভাল কথা। কিন্তু এত বড় বোমাবাজির পর কিভাবে যেন হিলিস অনিশ্চিত সংখ্যা বিষয়ক বেশ টেকনিক্যাল আলোচনায় জড়িয়ে পড়লেন, যেন এই মুহূর্তে পাঠকের মাথায় অনিশ্চিত সংখ্যার সাথে টুরিং প্রতিজ্ঞার সম্পর্কের প্রশ্নটিই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে সেই সব বাক্যগুলিকে, যেখানে হিলিস প্রমান রেখেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানীর বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক-নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির। এর কিছু নিচে তুলে দিলাম, জানিনা কারও ভাল লাগবে কিনা, তবে লাগলে বইটিও হয়ত লাগবে:
- কম্পিউটারের যেসব তাত্বিক সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলি মানুষ এবং কম্পিউটারের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নির্দেশ করেনা।
- এই অ্যালগরিদম, যার নাম মার্জ সর্ট, এতই সুন্দর যে সেটির বর্ণনা না দিয়ে পারছিনা . . .
- “কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা” বিষয়ে দার্শনিকরা প্রচুর আবর্জনা লিখে রেখেছেন।
- তথ্যা আদান-প্রদান এবং তথ্য সংরক্ষণ একই জিনিস, আদান-প্রদান তথ্য হল তথ্য একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো, আর সংরক্ষণ হচ্ছে তথ্য এক সময় থেকে আরেক সময়ে পাঠানো।
- টুরিং-এর মেশিনের সাথে আত্মীয়তায় আমার কোন লজ্জা নেই।
শেষ।
Leave a Comment
Leave a Comment
Leave a Comment